যে ক্ষত এখনো শুকায়নি :‘কোভিড বিধবা’দের জীবন প্রেক্ষিত

কথাসাহিত্যিক শরত্চন্দ্রের আত্মীয় নিরুপমা যখন ১৬ বছর বয়সে হঠাত্ বিধবা হয়েছিলেন, শরত্বাবু তা মেনে নিতে পারেননি। তাকে বলেছিলেন, ‘বুড়ি, বিধবা হওয়াটাই যে নারী জন্মের চরম দুর্গতি। কেননা, বিধবা শব্দটি নিজেই একজন নারীর সামাজিক অবস্থান বুঝিয়ে দেয়। “ধব” অর্থ প্রভু বা ভরণপোষণকারী, অর্থাৎ যার ভরণপোষণকারী নেই, সে-ই বিধবা।’ শব্দটির অর্থের যথার্থতা বজায় রেখে আমাদের সমাজ তাদের সামাজিকভাবে আরো প্রান্তিক বানিয়ে রাখে। পুরুষাধিপত্যে নির্মিত সামাজিক রীতিনীতিও কালক্রমে তৈরি হয়েছে পুরুষদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে। তাই অনায়াসে আমাদের সামাজিক রীতি ও লোকাচার একজন বিধবা নারীর আচরণ অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে। বিধবা শব্দটি মাথায় এলেই সেই নারীর পোশাক-পরিচ্ছদসহ আচরণগত অদৃশ্য সামাজিক বেড়াজাল বুঝিয়ে দেয় তাদের আসলেই কত বাধার সম্মুখীন হতে হয়। বিধবার সন্তানদের জোরর্পূবক বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম এমনকি তাদের অপব্যবহারসহ যৌন সহিংসতার মতো ঘটনার সম্মুখীন হতে দেখা যায়।

বাংলাদেশের সমাজকাঠামোয় নারীর অবস্থান প্রান্তিক। গ্রামীণ বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামো এমনভাবে শ্রমবিভাজিত, যেখানে একজন নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের প্রায় পুরোটাই অর্থনীতিতে অদৃশ্য। কেননা, পুরুষতান্ত্রিকতার যে দাস স্বয়ং পুরুষ, সেই দাসেরও দাস হলো এই নারী। তাই শ্রমবিভাজন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই এ দেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে, যার সূত্রপাত পরিবার থেকেই। সেই পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের উপার্জনের মূল দায়িত্ব পালন করে পুরুষেরা। অন্যদিকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকগত আমাদের সমাজে নারীর কাজ ঘর-গৃহস্থালি রক্ষণাবেক্ষণেই সীমাবদ্ধ। এ কারণে নারীর উপার্জনমুখী কাজের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বা কাজের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। সমাজের কমবেশি সব পেশাজীবী পরিবারের মধ্যে এমন চিত্রই প্রতিষ্ঠিত। ফলে, স্বামীর স্বাভাবিক বা আকস্মিক মৃত্যুতে একজন স্ত্রী মানসিক ও আর্থসামাজিকভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েন। কারণ স্বামীই পরিবারের একমাত্র কিংবা মূল আয়-উপার্জনকারী ও ভরণপোষণকারী।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় করোনায় আক্রান্ত দেশগুলোর একটি। এ দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, করোনায় মোট ২৯ হাজার ৪৪১ জন (১৬ জানুয়ারি ২০২৩) রোগীর মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। করোনায় মৃত্যুর ক্ষেত্রে লিঙ্গ পার্থক্য বিষয়ে ২০২০ সালের জুনে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি মতামত প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, নারীর চেয়ে পুরুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশি মারা গেছেন। বাংলাদেশে ২০২১ সালে একটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে যে, নারীর তুলনায় পুরুষ করোনা ভাইরাসে বেশি আক্রান্ত এবং মৃত্যুবরণ করেছেন। কোভিডে আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে পুরুষ ও নারীর মৃত্যুর অনুপাত ছিল ৭৯:২১। অর্থাৎ, করোনায় আক্রান্ত মৃত প্রতি পাঁচ জনের চার জনই পুরুষ। জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের দাবির সঙ্গে এই প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে দেখা যায় যে, মহামারি একটি সমাজের সামাজিক কাঠামোর বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্যকে আরো বাড়িয়ে তোলে, যার ফলে মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার ক্ষেত্রে নারীর দুর্বলতার দিকগুলো বৃদ্ধি পায়।

এটি স্পষ্ট যে, করোনা মহামারিতে অসংখ্য নারী সদ্য বিধবা হয়েছেন। অনেকেই তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবার পরিচালনার জন্য সংগ্রাম করছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগজনক বিষয়। ইউএন উইমেনের ২০১৮ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের মতে, গোটা বিশ্বে বিধবা নারীর সংখ্যা ২৫৮ মিলিয়ন, যাদের প্রতি ১০ জনের এক জন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন। এই মৃত্যু কেবল এক জন প্রিয় মানুষ বিয়োগেই সীমাবদ্ধ নয়, করোনা মহামারি এসব নারীকে জীবনসংগ্রামের নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। আগে কখনো নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করেননি। অনেকের কাজ করার প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা কাজের দক্ষতাও নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের হার ৩৮ শতাংশের নিচে। কাজেই অধিকাংশ নারীর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা তাদের অন্য সব আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে তোলে এবং নারীকে গড়ে তোলে একটি প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে।

আমাদের গবেষণার তথ্য সংগ্রহকালে কোভিডে স্বামী হারানো রাজিয়া বেগম বলেন, ‘করোনার আগে স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে সংসার করছিলাম। কিছু লোন নিয়ে ইট দিয়ে বাড়ির কাজ শুরু করি। ছেলেটা লেখাপড়া করত। ছোট মেয়েকে গাড়ি ও কিছু টাকা দেওয়ার কথা দিয়ে বিয়ে দিই। কিন্তু করোনা আমার জীবনটা সম্পূর্ণ পালটে দিয়েছে। ছেলেটা এখন অন্যের কাজ করে আর মেয়ের জামাইকে এখনো গাড়ি-টাকা দিতে পারি নাই।’ ক্রন্দনরত কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘করোনায় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আমার স্বামীকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করানো, স্বামীর মৃত্যু—এগুলো আমার জীবনে সব থেকে খারাপ দিন। অনেক দিন ছেলেকে নিয়ে শুকনো মুড়ি খেয়ে না খেয়ে কত রাত কাটিয়েছি ঠিক নেই। এদিকে পাওনাদার বাড়ি আসত। উপায় না পেয়ে ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, গহনা বিক্রি করে ঋণ শোধ করি আর সংসার চালাই।’ তার কণ্ঠে একজন ‘কোভিড বিধবার’ করোনা সংক্রমণে স্বামী হারানোয় কোভিড-পরবর্তীকালে সম্মুখীন জীবনসংগ্রামের কিছু নির্মম বাস্তবতার খণ্ড চিত্র ফুটে উঠেছে। কোভিডে বিধবা হওয়া এসব নারীকে পরিবার বাঁচাতে সংসারের হাল ধরতেই হয়। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থা কতটুকু উপযোগী ছিল তাদের এই যাত্রায়? 

ফাতেমা বেগম করোনার আগে তার স্বামীর সঙ্গে একটি আরামদায়ক উচ্চ-মধ্যবিত্ত জীবন যাপন করেছিলেন। একজন গৃহিণী ফাতেমা বেগম তার ছেলে ও পুত্রবধূসহ তাদের বিস্তীর্ণ বাড়িতে পরিবারের সবাই মিলে যত্নের সঙ্গে বসবাস করতেন। দেশের অনেকের মতো ২০২০ সালের জুলাইয়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তার স্বামী এবং তিনি সপ্তাহখানেকের মধ্যে মারা যান। ‘স্বামীর মৃত্যুতে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। এক ছেলে আতঙ্কে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশের এক স্কুলে থাকতে শুরু করে। এদিকে স্বামীর মৃত্যুর শোকে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। অনেকে বলাবলি করেছিল যে আমি আর বাঁচব না। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি।’ বললেন ফাতেমা বেগম। এ দেশের যেসব নারী করোনায় বিধবা হয়েছেন, তারা বর্ণহীন জীবনে অনেক মর্মান্তিক ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন। ফাতেমা বেগম উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে বসবাস করলেও তার নামে কোনো আর্থিক ব্যাংক হিসাব বা জীবনবিমা ছিল না। এ কারণে পড়তে হয়েছে বিভিন্ন আর্থসামাজিক সমস্যায়। নিজের ব্যাংক হিসাবে (মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিংসহ) সঞ্চয় করা, ঋণ নেওয়া, ব্যয় করা এবং লেনদেন সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে। নারী-পুরুষ গ্রাহকের হার বোঝাতে পুরোনো তথ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালে গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটা অনুসারে বাংলাদেশে আর্থিক সেবার যেকোনো একটিতে প্রবেশাধিকার রয়েছে মাত্র ৩৬ শতাংশ নারীর। ২০১৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন সার্ভে অনুসারে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক হিসাব রয়েছে ৩২ শতাংশ নারীর।

নিজস্ব আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বিধবা নারীরা তাদের স্বামীর মৃত্যুর পর মানসিক ও আর্থসামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আমাদের গবেষণায় অংশগ্রহণকারী কোভিড-১৯-এ বিধবা নারীদের ‘যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ’ গৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, কোভিড বিধবাদের আর্থসামাজিক জীবনে আকস্মিক পরিবর্তনে তারা অনেকেই দিশেহারা, অনেকেই মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যে নারী স্বামী বেঁচে থাকতে ছিলেন সংসারের লক্ষ্মী, আগলে রাখতেন সংসার, সেই নারীই স্বামীর অকালমৃত্যুতে হয়ে যান সহায়, সম্বলহীন। মানুষের মৃত্যু অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু একজন মানুষের মৃত্যু অন্যজনকে মৃত্যুর থেকেও বেশি যন্ত্রণায় পর্যবসিত করে রাখবে—এমন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা অনুচিত। কোভিড বিধবাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সমাজকাঠামোর বড় বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। একজন পুরুষের নারী সঙ্গীটির মৃত্যু তাকে শোকাভিভূত করে, কিন্তু তার আর্থসামাজিক অবস্থান অপরিবর্তিতই থাকে। অন্যদিকে পুরুষ সঙ্গীটির মৃত্যু নারীকে করে তুলছে সহায়-সম্বলহীন, দিচ্ছে অনিশ্চিত জীবন। কেন এই অসমতা? এর দায় কার? নারীটির, নাকি আমাদের সমাজকাঠামোর? 

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া আমাদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোয় বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে। আমরা মনে করি, উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপেক্ষিতে আশু সমাধানের  লক্ষ্যে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও কোভিড-পরবর্তী মোকাবিলা পরিকল্পনায় ‘কোভিড বিধবাদের’ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। 

লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন, ব্রিটিশ কলম্বিয়া, কানাডা এবং অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়