ইভিএম মেশিন লুট, প্রার্থীর বাড়িতে হামলা

উপজেলা পরিষদের পঞ্চম ধাপের নির্বাচনে এসে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। প্রার্থীর বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে এই ঘটনা ঘটে। এছাড়াও সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, একজন চেয়ারম্যান প্রার্থী লাঞ্ছিত হয়েছেন। অনিয়মের অভিযোগে গাজীপুর সদর উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জন করে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। খুলনার ডুমুরিয়ায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে পিস্তল ও গুলি খোয়া গেছে।

গতকাল পঞ্চম ধাপে ২০ উপজেলায় ভোট সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হয়। চারটি উপজেলায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হয়। যেসব উপজেলায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, এগুলো হলো-শেরপুরের নকলা, নাটোরের নলডাঙ্গা, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, পটুয়াখালীর রাংগাবালী, বরগুনার তালতলী, নারায়ণগঞ্জ বন্দর, গাজীপুর সদর, রাজবাড়ীর কালুখালী, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ, মাদারীপুর সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর, নোয়াখালী সদর, রাজশাহীর পবা, নেত্রকোনার পূর্বধলা, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া, ফেনীর ছাগলনাইয়া এবং খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা। প্রথমবার দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত এই ভোটে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল বর্জন করায় ভোটারের উপস্থিতি ছিল বরাবরের মতো কম।

ইভিএম লুট : ব্রাহ্মণবাড়িয়া/বিজয়নগর প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে ভোট চলাকালীন একটি কেন্দ্রের ইভিএম মেশিন লুট করে নেওয়া হয়। বেলা ১২টার দিকে চান্দুরা ইউনিয়নের সাতগাঁও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী তানভীর ভুঁইয়ার এজেন্টদের বিরুদ্ধে ইভিএম যন্ত্রাংশ লুট করে নেওয়ার অভিযোগ উঠে। এ সময় প্রায় ২ ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ ছিল। স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নাছিমা মুকাই আলীর ঘোড়া প্রতীকে বেশি ভোট পড়ছে বুঝতে পেরে নৌকা প্রতীকের এজেন্টরা হঠাত্ করে আক্রমণ চালায়। এ সময় তারা কয়েকটি মনিটর লুটে নিয়ে যায় এবং কয়েকজনকে মারধর করে।

ভোটকেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নূর মাহমুদ জানান, দুপুরে হঠাত্ করে কয়েকজন বুথে আক্রমণ করে। তারা ইভিএমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি মনিটর ভাঙচুর করে চারটি মনিটর লুটে নিয়ে যায়। বুধন্তি ইউনিয়নের   শশই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন ঘোড়া প্রতীকে ভোট বেশি পড়ায় বেলা সাড়ে ১১টা থেকে প্রায় ১ ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখে। সাড়ে ১২টার দিকে পত্তন ইউনিয়নের বড়পুকুর পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বহিরাগত নৌকার সমর্থক ও এলাকাবাসী ঘোড়ার সমর্থকদের মধ্যে মারামারি বেধে যায়। এসময় পুলিশ কনস্টেবল রিপন মোদক, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ, সাবেক ভিপি হাসান সারোয়ার সহ ৭/৮ জন আহত হন। এছাড়া লক্ষীমুড়া এলাকায় কেন্দ্রের বাইরে নৌকা ও ঘোড়ার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এ ঘটনার জের ধরে স্বতন্ত্র প্রার্থী নাছিমা লুত্ফর রহমানের জেলা শহরের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। দুর্বৃত্তরা ২টি জিপ, করোলা প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ব্যাপক ভাঙচুর ও পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে এবং ২টি মোটরসাইকেল লুট করে নিয়ে যায়। দুর্বৃত্তরা বাসভবনের ফটক ভেঙে প্রার্থীর অফিস কক্ষ, জেনারেটর কক্ষ, অভ্যর্থনা কক্ষ, প্রহরীর ২টি কক্ষসহ নিচতলার ৫টি কক্ষ ভাঙচুর করে দোতলায়ও ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এসময় বাড়ির বিভিন্ন আসবাবপত্রও ভাঙচুর করা হয়। পরে তারা বাসভবনের আন্ডার গ্রাউন্ডে প্রার্থীর ব্যবহূত ল্যান্ড ক্রুজার, পাজেরো জিপ, টয়োটা সেলুন প্রাইভেটকার, এই বাড়ির ভাড়াটিয়া দৈনিক আজকালের খবরের জেলা প্রতিনিধি মোজাম্মেল চৌধুরীর মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৩টি রামদা, ২টি চাপাতিসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করে। নাছিমা মুকাই আলী অভিযোগ করে বলেন, নৌকা প্রার্থীর লোকজন আমার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। আমার গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এসময় পুলিশ এ হামলায় জড়িত সন্দেহে জেলা সৈনিক লীগের আহবায়ক ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম জুম্মান, মেহেদী হাসান, মারুফ মিয়া, আরমান, ইয়াছিন আরাফাতকে আটক করে।

কামারখন্দে প্রার্থী লাঞ্ছিত : কামারখন্দ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কামারখন্দ উপজেলা নির্বাচনে সংঘর্ষ ও মারপিটের দুটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া কোনো সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। ইসির কড়া নির্দেশনার কারণে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যম কর্মীদের তত্পরতায় নির্বাচন মোটামুটি সুষুমভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে কামারখন্দের চৌবাড়ী ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা ৮/১০ জনকে মারপিট করে। এর মধ্যে দেশীয় অস্ত্র ফালার আঘাতে গুরুতর আহত সরকারি এপিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম ভুট্টুকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অপরদিকে, নিজের কেন্দ্রে ভোট দিয়ে ফেরার পথে নৌকার সমর্থকদের হাতে লাঞ্ছিত হন চেয়ারম্যান পদে আনারস প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রকৌশলী শামসুল আলম শফি। দুপুরের আগে দশসিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

গাজীপুর সদরে স্বতন্ত্র দুই প্রার্থীর ভোট বর্জন :গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্রপ্রার্থী বিএনপি নেতা মো. ইজাদুর রহমান চৌধুরী ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. হাবিবুর রহমান ভোট বর্জন করেছেন। পৃথকভাবে সংবাদ সম্মেলন করে তারা ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে পুনঃ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ভোট গ্রহণ শুরুর দুই ঘণ্টা পর ইজাদুর রহমান তার নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন জানান, কোথাও নির্বাচনের পরিবেশ নেই। সবগুলো কেন্দ্র থেকে মারধর করে তার নির্বাচনী এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বিকালে চশমা প্রতীকের ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. হাবিবুর রহমান নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।

পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তল ও গুলি উধাও : খুলনা অফিস জানায়, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে সহকারী পুলিশ পরিদর্শক (এএসআই) মো. নাজমুল হক নামে এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি পিস্তল ও ১২ রাউন্ড গুলি খোয়া গেছে। দুপুরে বানিয়াখালী হাইস্কুল থেকে এ পিস্তল ও গুলি খোয়া যায়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।

মঠবাড়িয়ায় শান্তিপূর্ণ ভোট : মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নজিরবিহীন কঠোর নিরাপত্তায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ৮১টি ভোট কেন্দ্রে এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়।