মোবাইল অ্যাপস ও ফেসবুকে বেতার

আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব বেতার দিবস। ইউনেস্কো-ঘোষিত আন্তর্জাতিকভাবে এ বিশেষ দিবসটি আজ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে। এ বছর বেতার দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Radio and Peace’ তথা বেতার ও শান্তি। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ বেতার। এছাড়াও কমিউনিটি রেডিও এফএম সম্প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক এবং বিনোদনমূলক বিভিন্ন তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। অ্যাপসের মাধ্যমে সহজেই রেডিও শোনা যাচ্ছে বলে এর শ্রোতা দিন দিন বাড়ছে। বেতার সবচেয়ে প্রাচীন এবং জনপ্রিয় গণমাধ্যম হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা সর্বত্র।  জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা ও দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হতে শিখেছে বেতার থেকে। তাই বেতারের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

প্রযুক্তির কল্যাণে আজ আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ, বিনোদন এবং তথ্য পাচ্ছি খুব সহজেই। কিন্তু একসময় বেতার ছাড়া এগুলো কল্পনা করা যেত না। তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বেতারও নিজের অবস্থানকে ধরে রাখতে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে। এখন আর ব্যাটারিচালিত রেডিওসেট নিয়ে বেতারের বিভিন্ন তথ্য পেতে হয় না। বেতার এখন হাতের মুঠোয় এবং ভ্রাম্যমাণ হয়েছে। মোবাইলে আজ সহজেই বেতারের বিভিন্ন কেন্দ্রের সংবাদ ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান শোনা যাচ্ছে। মোবাইল অ্যাপস এবং ফেসবুক লাইভে এখন বেতার নিজের জায়গা দখল করে নিয়েছে। মোবাইলের সাহায্যে সহজেই বেতার থেকে যে কোনো তথ্য পাচ্ছেন শ্রোতারা। তাই তো এখন আর আয়োজন করে রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান কিংবা বাড়ির উঠানে একসঙ্গে বেতার শ্রোতারা ভিড় জমায় না।

আমাদের দেশে বেতারের শ্রোতা কত এবং কতগুলো রেডিও আছে, তা বলা কঠিন। তবে মোবাইল ব্যবহারকারী অনেকেই আজ একজন বেতার শ্রোতা। কারণ খুব কম মোবাইল ফোন আছে যেখানে রেডিও শোনার ব্যবস্থা নেই। মোবাইল ফোনে সহজেই রেডিও শোনার ব্যবস্থা আছে বলে আলাদা করে সেট নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টেলিভিশন ব্যবহার কিংবা পত্রিকা পড়ার সুযোগ থাকে না বলে তাদের অনেকে আজ বেতারের ওপর নির্ভরশীল। বেতারের মাধ্যমে তারা সহজেই বিভিন্ন খবর ও প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে থাকে।

যানজট ও ব্যস্ত নগরীতে বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বেতার। এফএম কিংবা অ্যাপসের মাধ্যমে ক্লান্তি নিবারণ করতে শ্রোতারা ফিরে আসছে বেতারের সঙ্গে। যানজট পরিস্থিতি, দেশ-বিদেশের হালচাল, আগাম আবহাওয়া বার্তা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশসহ বিভিন্ন তথ্য সহজেই পাচ্ছে বেতার থেকে। স্যাটেলাইটের ভিড়ে বেতার হারিয়ে যাবে—এমন ভাবনা আজ অবাস্তব। কৃষক তার জমিতে ভালো ফসল ফলাতে বেতারের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য নিচ্ছেন। নারীরা তাদের শরীরের যত্ন ও গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরিচর্যার তথ্য নিতে বেতারে কান পাতছেন। আবার মাঠে কিংবা দোকানে সর্বত্র একটু অবসরে বিনোদনের খোরাক জোগাচ্ছে বেতারের বিভিন্ন গান ও অনুষ্ঠান। এছাড়াও শিক্ষার্থীদের জন্য আসর, ঘরে বসে শিখি, আমার ঘরে আমার স্কুল ইত্যাদি অনুষ্ঠান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ করে যাচ্ছে। তাই তো বেতার আজ সবার জন্য সবখানে।

বর্তমানে চিকিৎসা, কৃষি ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির প্রচার মাধ্যম বেতার। এখন আর বিভিন্ন অফিসে যাওয়া লাগে না। কৃষকরা বেতার শুনে কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে পারেন। সুবিধাবঞ্চিত বা প্রতিবন্ধীরা সমাজসেবা থেকে কীভাবে সেবা নিতে পারবেন—তার বিস্তারিত জানতে পারে বেতার থেকে। ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কাজ কীভাবে করতে হয়, তা-ও জানা যাচ্ছে বেতারের মাধ্যমে। ডিজিটাল সেবা গ্রহণের জন্য কার কাছে কখন যেতে হবে—তা জানতে শ্রোতারা বেতারে কান পাতছে। বেতার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, ঠিক তেমনি আনন্দদায়কও করেছে বটে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ বেতার। এর অধীনে বিভাগীয় শহরগুলোতে আলাদাভাবে বেতারের আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। একঝাঁক মেধাবী ও কর্মঠ জনবল নিয়ে এখান থেকে শুধু সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের প্রচারই হয় না বরং শ্রোতাদের পছন্দের বিভিন্ন অনুষ্ঠানও সম্প্রচার করা হয়। দেশে জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে অনেক বেসরকারি কমিউনিটি রেডিও এফএম সম্প্রচারের মাধ্যমে শ্রোতাদের আকৃষ্ট করছে। তবে সরকারিভাবে তরুণ বেতার উপস্থাপকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের জন্য  বেতার উপস্থাপন নীতিমালা প্রণয়ন খুবই জরুরি। কেননা তাদের কাছ থেকে বাংলিশ ভাষা কেউ প্রত্যাশা করেন না।  আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভিড়ে বেতার এখন টিকে থাকলেও অনুষ্ঠান মান আরো উন্নত হওয়া দরকার। তথ্য মানুষকে শক্তিশালী ও সচেতন করে। যে কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে সঠিক তথ্য দরকার। অনেক সময় উপস্থাপকদের ভাষাগত ভুল ও তথ্যের গরমিল থাকায় সাধারণ ও অল্পশিক্ষিত মানুষ সঠিক তথ্যটা খুঁজতে পারে না। এখনো নিয়মিত পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হচ্ছে বড় বড় অতিথিদের মাধ্যমে। কিন্তু শ্রবণ মান ভালো না থাকায় বা কারিগরি ত্রুটির কারণে শ্রোতারা বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের অঞ্চলভিত্তিক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কমিউনিটি রেডিও চালু হয়েছে। তারা হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন গান, ভাষা, নাটক, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আর্থিক সহায়তা করা হয় না। ফলে তাদের ভিত্তি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচাতে তাই সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।

বিশ্ব বেতার দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—বেতার থেকে আমরা তথ্য ও জ্ঞান পেয়ে আগামীর সম্ভাবনাময় স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাব।

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় বেতার শ্রোতা ক্লাব, বাংলাদেশ বেতার