সময় এসেছে স্পেস সোলার প্যানেল নিয়ে ভাবার

মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর সবচেয়ে রৌদ্রকরোজ্জ্বল অঞ্চল। সূর্যের আলো খুব ভালোভাবে পৌঁছায় উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলেও। মোটা দাগে এ দুটি অঞ্চল ছাড়া পৃথিবীর আর তেমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে সূর্যের আলো ও তাপকে কাজে লাগিয়ে শক্তি উৎপাদনের কথা ভাবা যায়। পৃথিবীর বাইরে তথা মহাকাশে শক্তি উৎপাদনের বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরে। আমরা জানি, মহাকাশে সূর্য চিরকাল জাজ্বল্যমান। তাছাড়া মেঘ বা ধুলোবালুর ঝামেলাও নেই মহাশূন্যে। এই অর্থে মহাকাশ হতে পারে শক্তি উৎপাদনের অন্যতম ক্ষেত্র। আর মহাকাশে সোলার প্যানেল গড়ে তোলার আদর্শ স্থান হলো ‘মরুভূমি অঞ্চল’ তথা মধ্যপ্রাচ্য।

সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ‘নিওম প্রকল্প’ ইতিমধ্যে মহাকাশ সোলার প্যানেলের বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। একটি ব্রিটিশ কোম্পানি এই স্পেস সোলার প্রকল্পে বিনিয়োগও করেছে। আমরা দেখেছি, এই প্রকল্পকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আলাপ করতে সম্প্রতি সৌদি স্পেস কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেন যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যসচিব। শুধু সৌদি আরব কিংবা যুক্তরাজ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীনও মহাকাশে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানিসংকটের যে অভিঘাত আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তার পরিপ্রেক্ষিতে ‘মহাকাশ সৌরবিদ্যুৎ’ আগামী দিনগুলোতে যে কতটা অপরিহার্য হতে চলেছে তা সহজেই অনুমেয়। দেশগুলো এই বাস্তব সত্য উপলব্ধি করেই যে ‘স্পেস সোলার প্যানেল’কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে, এ কথা বলাই বাহুল্য।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্থলভিত্তিক ‘সোলার ফটোভোলটাইক পাওয়ার’ সেক্টরে আমরা অসাধারণ অগ্রগতি করেছি। বিশেষ করে স্থলভিত্তিক সৌরশক্তির প্রশ্নে মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলে বড় বড় সোলার সিস্টেম প্ল্যান্ট গড়ে উঠেছে। এ কথা সত্য, বায়ুবিদ্যুতের প্রশ্নেও আমরা বেশ খানিকটা অগ্রগতি করেছি। তবে কীভাবে কার্বন নিঃসারণ আরো কমানো যায়, সেই ভাবনা থেকে শক্তি উৎপাদনে জুতসই ব্যবস্থার অপরিহার্যতা থেকেই যায়। উপরন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয় এড়াতেও দিনে দিনে তা ‘অনেক বেশি জরুরি’ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় মহাকাশ সৌরবিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, উৎপাদনের দিক দিয়েও বায়ুবিদ্যুতের চেয়ে মহাকাশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অনেক এগিয়ে। সব মিলিয়ে টেকসই শক্তিব্যবস্থা গড়ে তুলতে মহাকাশ সৌরবিদ্যুৎ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে পৃথিবীব্যাপী।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, পৃথিবীতেই কেন বৃহৎ আকারে সোলার প্যানেল নির্মাণ নয়? এক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার, পৃথিবীতে দিনের বেলা ছাড়া সূর্যের আলো পড়ে না। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে সব সময় আলো না জ্বলার কারণে এবং তাপ না পৌঁছানোর কারণে এখানকার সোলার প্যানেলগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সুফল লাভ করা দুরূহ। এই অবস্থায় সূর্যের আলো ও তাপ সংরক্ষণ করে তথা ব্যাটারি চার্জের মাধ্যমে কাজ চালানো হয়ে থাকে, যাতে ব্যাপক আকারে ও চাহিদামতো শক্তি উৎপাদন অনেকাংশে সম্ভব নয়। তাছাড়া এই কাজে লম্বা ও উচ্চ ভোল্টেজের তার ব্যবহারের দরকার পড়ে, যা বেশ ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এসব বিবেচনায় মহাকাশ সৌরশক্তির ব্যবস্থা ফলপ্রসূ হতে পারে।

সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে একটি জরিপ চালানো হয়। এই জরিপের ফল বলছে, মহাকাশভিত্তিক সৌরশক্তি প্রযুক্তিগতভাবে অধিক টেকসই। এই প্রকল্প বেশ সাশ্রয়ীও। জরিপে উঠে আসে, সৌর প্যানেল স্থাপনে ব্যয় আশ্চর্যজনকভাবে কম। ২০১৪ সালে এক লেখায় বিষয়টি তুলে ধরেছিলাম আমি। সে সময় মহাকাশে প্যানেলের উপাদান পাঠানোর খরচের একটি হিসাব দিয়েছিলাম। কক্ষপথে প্রতি কেজি উপাদান উত্তোলনের জন্য প্রায় ১০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হবে বলে বলা হয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, এই খরচ এখন অনেক কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতি কেজি উপাদান মহাকাশে পাঠাতে বর্তমানে ব্যয় করতে হবে মাত্র ১ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ, মহাকাশ সৌরশক্তি প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে অনায়াসে।

মনে করা হচ্ছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ স্পেস সোলার প্রকল্পের অধীনে ২ গিগাওয়াট সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এ তো মহাকাণ্ড! কেননা, বর্তমানে আবুধাবিতে নির্মাণাধীন আলধাফরা প্ল্যান্টে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, এটা তার সমপরিমাণ।

এখন কথা হলো, স্পেস সোলার প্যানেল নির্মাণে কী কী কঠিন বাধা পেরোতে হবে, তথা কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এ ধরনের প্রকল্প নির্মাণে কী পরিমাণ খরচ হতে পারে? প্রথম অপারেটিং সিস্টেমের জন্য প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থাৎ, প্রাথমিক পর্যায়ে যথেষ্ট সরকারি সহায়তার প্রয়োজন পড়বে। তাছাড়া মহাকাশে প্রকল্পের উপাদানসমূহ পাঠাতে প্রাথমিকভাবে যেসব রোবট ব্যবহারের দরকার পড়বে, তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণও প্রধানতম প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ বলে মনে করা হচ্ছে। এ ধরনের আরো কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। তবে এ কথা মানতে হবে, টেকসই শক্তিব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে চ্যালেঞ্জের সামনে একসময় না একসময় দাঁড়াতে তো হবেই!

এখন পর্যন্ত এটা নিশ্চিত নয় যে, স্পেস সোলারকে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা যাবে কি না। তবে আপাতত এই নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে, পারমাণবিক ফিউশনের মতো অন্যান্য ভবিষ্যৎ বিকল্প শক্তিব্যবস্থার চেয়ে স্পেস সোলার প্রকল্প অধিক সহজসাধ্য।

এখন অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, কেন মধ্যপ্রাচ্যই স্পেস সোলার প্যানেল প্রকল্পের জন্য আদর্শ অঞ্চল? এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব, আকাশের দিকে তাকান। নিরক্ষরেখার কাছাকাছি এমন উন্মুক্ত ভূমি কিংবা উচ্চতর স্থান মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া আর কোথাও কি আছে? উল্লেখ করা দরকার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব সক্রিয় মহাকাশ কর্মসূচি রয়েছে। মঙ্গলে একটি অরবিটার পাঠানোর চিন্তা চলছে দেশটির পক্ষ থেকে। আগামী এপ্রিল নাগাদ চাঁদে অনুসন্ধান চালানোর চিন্তাও করছে দেশটির সরকার। এসব উদ্যোগ স্পেস সোলার প্যানেল প্রকল্পে গতির সঞ্চার করবে নিঃসন্দেহে। তবে এ তো সত্য, স্পেস সোলার সিস্টেমকে বাস্তবে পরিণত করতে চাইলে বসে থাকলে চলবে না। বিশেষ করে এর জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা বাড়াতে হবে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ব্যাপারেও বিস্তর ভাবতে হবে। কয়েক বছর আগেও যা কল্পকাহিনি ছিল, তা বাস্তবে পরিণত করে দেখাতে চাইলে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সত্যি বলতে, জ্বালানিসংকটের কারণে বর্তমানে বিশ্বে, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে যেভাবে হিমশিম খাচ্ছে বিভিন্ন দেশ, তা থেকে মুক্তি পেতে টেকসই ব্যবস্থা হিসেবে ‘স্পেস সোলার সিস্টেম’ গড়ে তোলার প্রশ্নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের সময় এসেছে।

লেখক : দুবাইয়ের বিখ্যাত এনার্জি কনসালটেন্সি কোম্পানি ‘কামার এনার্জি’র সিইও ও ‘দ্য মিথ অব দ্য অয়েল ক্রাইসিস’ বইয়ের লেখক

এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন