গত এক দশকে বাংলাদেশের যাতায়াত ব্যবস্থা অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করেছে। সরকার দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। ফলে, দেশে বেশকিছু প্রশস্ত সড়ক, মহাসড়ক ও সেতু বিশ্বমান বজায় রেখে নির্মিত হয়েছে। এছাড়া পুরোনো অনেক সড়ক ও মহাসড়ক সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং কিছুর কাজ চলমান রয়েছে। মহাসড়কের মধ্যে ২০১৬ সালে গৃহীত ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা চার লেনের মহাসড়ক অন্যতম।
সেতুর মধ্যে অবশ্যই পদ্মা সেতুর কথা সবার আগে বলতে হয়। এ সেতু নির্মাণে সংশয় দেখা দিয়েছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্বে সরকার নিজ দেশের জনগণের অর্থে এই সেতু নির্মাণ করেছে। এটি একটি দুঃসাহসিক ও সফল কাজ। এছাড়া আরো অনেক সেতু এবং প্রশস্ত সড়ক নির্মাণ ও মেরামতের মাধ্যমে সারা দেশের সড়ক যাতায়াত ব্যবস্থাকে দ্রুত গতিসম্পন্ন করেছে। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক যাতায়াতে সরকার ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং জনগণ এর সুফল পাচ্ছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে দেখা প্রয়োজন। আধুনিক সড়ক ও সেতু হয়েছে, কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা কমছে না। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে অকাল পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েই চলছে। এটা ভালো কথা নয়। সড়কে মৃত্যু না কমে আরো বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের বিষয়টি সবারই আরো গভীর মনোযোগের দাবি রাখে। করোনা মহামারির সময়েও সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। সরকারি হিসাবমতে, ২০২১ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
বিআরটিএর হিসাবে প্রতিদিন সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ জন প্রাণ হারায়। সে হিসাবে বছরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৮০০ জন। তবে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বিষয়ে বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে বলছে, এ সংখ্যা ১২ হাজার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সেটা ২০ হাজার। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন। এ সব কারণের মধ্যে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, জরাজীর্ণ সড়ক, অযোগ্য যানবাহন, অদক্ষ চালক, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন বা হেডফোন ব্যবহার এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব অন্যতম। এছাড়া আরো কিছু কারণের কথা বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে জানা যায়, চালকদের দীর্ঘসময় গাড়ি চালানো ও ট্রিপকেন্দ্রিক গাড়ি চালানোর বিষয়টিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তবে আমি গত ৪০ বছর দেশে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা দূরীকরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। তন্মধ্যে, মাদক ও ধূমপানবিরোধী কার্যক্রম অন্যতম। আমার পর্যবেক্ষণ হলো সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চালকদের মাদকাসক্তি। মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো ঠিক নয়। এ সময় অনেকের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না বলে দুর্ঘটনার জন্ম দেয়। আর একেকটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না হিসেবে আবির্ভূত হয়। চালকদের মধ্যে মাদকাসক্তি কিংবা ধূমপান ও তামাকে আসক্তি নিয়ে দেশে সুনির্দিষ্ট গবেষণা নেই। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকায় কমপক্ষে ৫০ হাজার গণপরিবহন চালক ও তাদের সহকারীরা মাদকাসক্ত। ক্রমাগত ক্লান্তি ও বিষণ্ণতায় বেশির ভাগ চালক ও চালকের সহকারীরা (হেলপার/কন্ডাক্টর) ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য সেবন করে থাকে। বিষয়টি পরিবহন মালিকসহ সংশ্লিষ্টরাও স্বীকার করেছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের কাছ থেকে প্রাপ্ত ১৯৯৮-২০১৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট জানায়, দেশে প্রায় ১০ শতাংশ চালক মাদকদ্রব্য সেবন করে। আলোচিত বিষয় ‘গণপরিবহনে নারীদের প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি’র ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে ড্রাইভার ও সহকারীদের মাদকাসক্তিকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাদকাসক্তি বর্তমানে চালকসহ ও পরিবহন সেক্টরের একটি শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। পরিবহন সেক্টরের নেতৃবৃন্দও বিষয়টি মেনে নিয়ে এর সমাধানে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু, এক্ষেত্রে দৃশ্যমান উন্নতি চোখে পড়েনি।
‘বেপরোয়া ড্রাইভিং’ বাংলাদেশে সড়কে প্রাণহানির প্রধান কারণ এবং এই বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের জন্য প্রধানত মাদকাসক্তিকে দায়ী করা হয়। চালকদের মধ্যে মাদকাসক্তি প্রতিরোধে ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নিয়েছে বিআরটিএ। এমনকি ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গেলেও লাগবে ডোপ টেস্ট। ৩০ জানুয়ারি ২০২২ থেকে ডোপ টেস্ট ছাড়া কোনো পেশাদার চালককে আর লাইসেন্স না দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। যা অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। কিন্তু ডোপ টেস্টের জন্য হাসপাতালগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, লোকবল সংকটসহ অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। সীমাবদ্ধতা আছে পুলিশ বাহিনীতেও। বিশেষ করে শনাক্তকরণ মেশিন না থাকায় পুলিশ মাদক সেবনকারীদের শনাক্ত করতে পারে না। এছাড়া শনাক্তকরণ কার্যক্রম পরিচালনায় পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ জনবল নেই।
অতএব, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে পেশাদার চালকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও তাদের মাদক ও ক্ষতিকর নেশা মুক্ত করতে হবে। সড়কে মানুষের জীবনের সুরক্ষায় কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়া উচিত হবে না। তাদের ডোপ টেস্টের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত শব্দসৈনিক, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস ও সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড