মূল্যস্ফীতির অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ

যে কোনো ঘটনার দুই রকম কারণ থাকে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ কারণ, অপরটি পরোক্ষ কারণ। সেই কারণগুলো কখনো স্থায়ী হয় যদি এর প্রতিক্রিয়া সেই কারণকেই আরো উজ্জীবিত করে। আর যদি প্রতিক্রিয়া সেই কারণকে উজ্জীবিত না করে, তাকে অবদমিত বা দূরীভূত করে, তাহলে জিনিসটি অস্থায়ী হয়। মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা এমন একটি অবস্থাকে বুঝি, যেখানে সবকিছুর মূল্য বা দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকে। আসলে কথাটি মূল্যস্ফীতিই হওয়া উচিত, যদিও আমরা মুদ্রাস্ফীতি বলে থাকি। 

আমরা মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রাস্ফীতি যা-ই বলি না কেন, বিষয়টি হচ্ছে জিনিসপত্রের মূল্যস্তর ওপরে উঠে যাওয়া। মানুষের আয় বা ক্রয়ক্ষমতা না বেড়ে যদি মূল্যস্তর ওপরে উঠে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ বাড়ে। মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হওয়ার অর্থ হচ্ছে অনেকগুলো পণ্যের দাম একই সঙ্গে বেড়ে যাওয়া। মূল্যস্ফীতি সব সময় যে খারাপ তা নয়। বাজার অর্থনীতিতে কিছুটা মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি না হলে উৎপাদক শ্রেণি বিনিয়োগের জন্য চাঙ্গা হবে না। কিন্তু সেই মূল্যস্ফীতি যেন অসহনীয় পর্যায়ে উন্নীত না হয়, নতুন বিনিয়োগ ও নতুন উৎপাদন দ্বারা পুনরায় ভারসাম্য ফিরে আসে, সেটা বিবেচনায় রাখতে হয়। 

মূল্যস্ফীতি হলে কোনো পণ্যের মূল্য বা দাম কিছুটা বাড়ে আবার কোনোটির দাম অনেক বাড়ে। কিন্তু কোনো পণ্যের দাম সাধারণত কমে না। মূল্যস্ফীতি সাধারণত দুই-তিন বছর ধরে বাড়ে। কাজেই মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করতে গেলে আমাদের একটি বেইজ লাইন ধরতে হবে, যার ওপর ভিত্তি করে মূল্যস্ফীতির স্তর নির্ণয় করা যায়। বেইজ লাইনের ওপর পণ্যমূল্য কতটা বৃদ্ধি পেল সেটাই বিবেচ্য বিষয়। যদি সব পণ্যের দাম শতভাগ বেড়ে যায়, অর্থাৎ দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে কোনো পণ্যের আপেক্ষিক দাম কিন্তু বাড়ল না। বাংলাদেশে করোনার কারণে সব পণ্যের উৎপাদন কম-বেশি হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন মোটেও কমেনি। তবে ভোক্তাদের আয় হ্রাস পেলে চাহিদাও সেই অনুপাতে কিছুটা কমার কথা। কিন্তু কিছুসংখ্যক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আছে, যার চাহিদা সেভাবে হ্রাস পায় না। যেমন চাল। মানুষকে বেঁচে থাকার জন্য চাল কিনতেই হবে। দাম বাড়ার পাশাপাশি আয় না বাড়লে সে হয়তো চিকন চাল না কিনে মোটা চাল কিনবে। কিন্তু চাল তাকে কিনতেই হবে। ঠিক একই কথা প্রযোজ্য ওষুধের ক্ষেত্রেও। 

এই সব জটিলতা উপেক্ষা করে আমরা সাধারণভাবে বলতে পারি, করোনার কারণে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা খুব একটা কমেনি, কিন্তু মানুষের আয় কমে গেছে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপার্জন ও আয় সাংঘাতিকভাবে কমে গেছে। মানুষের আয় হ্রাস পেলে বাজারে পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে কমার কথা। কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ করলাম বাজারে পণ্যের দাম কমেনি। করোনার সময় অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এলো, কিন্তু নিত্যপণ্যের মূল্য হ্রাস পেল না—এটা অর্থনীতিবিদদের কাছে ব্যাখ্যার দাবি রাখে। এর একটি সহজ উত্তর হচ্ছে করোনা অবস্থায় বাজারে পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছিল। তারপর আবার তা কমে যায়, কিন্তু পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়নি। করোনার সময় উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সমস্যার সৃষ্টি হয়। সেই সময় মানুষ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। গ্রাম থেকে শহরে পণ্য আসার ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হওয়ার কারণে সে সময় প্রত্যক্ষভাবে পণ্যের দাম বেড়েছিল। সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে মূল্যস্ফীতি ঘটতে পারে। এর পরে যে বর্তমানে আবার দাম বাড়ছে, তার অবশ্য অন্য একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে হয়। শুধু সিন্ডিকেটের কারসাজি দিয়ে এর সবটা ব্যাখ্যা করা যাবে না।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন পণ্যের যে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তার পেছনে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধও পরোক্ষ অবদান রেখেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম ব্যাপকভাবে বাড়ে। ফলে সমুদ্রের জাহাজভাড়া আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে গেছে। জাহাজের ভাড়া যখন বেড়ে যায়, তখন জাহাজে যেসব পণ্য আমদানি করা হয় তার দাম স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। আমদের দেশে যেসব পণ্য আমদানি করা হয়, তার বেশির ভাগই আসে জাহাজে করে। আমদানি পণ্য আবার দুই ধরনের। একটি হচ্ছে ভোগ্যপণ্য অপরটি হচ্ছে শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ। তাই পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে সব পণ্যের দামই বাড়বে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন বিশ্বব্যাপী ভেঙে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর জ্বালানি তেলের জোগান বাড়ানোর জন্য চাপ বেড়েছে। এই সুযোগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমিয়ে বা স্থির রেখে দাম বাড়িয়েছে। ফলে জ্বালানি তেল, গ্যাস ইত্যাদির দাম বেড়েছে।

উৎপাদন কম হলে সরবরাহ কমে গিয়ে পণ্যটির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। অবশ্য উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি যদি চাহিদাও কমে যায়, তাহলে পণ্যের দাম বাড়ার তেমন কোনো কারণ থাকে না। আবার কোনো পণ্যের দাম বাড়া এবং ভোক্তার আয় কমে যাওয়ার কারণেও ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। পণ্যের দাম কমে গেলেও মানুষ তা কিনতে পারবে না, যদি তার ক্রয়ক্ষমতা আরো বেশি কমে যায়। ক্রয়ক্ষমতা দুই কারণে কমে যেতে পারে।  ভোক্তার বেকারত্ব ও আয় কমে যাওয়ার মাধ্যমে যদি ক্রয়ক্ষমতার সংকট হয়, তাহলে সেই অবস্থাকে মন্দা বলা হয়। মন্দাকালীন অবস্থায় পণ্যের দাম কমে গেলেও মানুষ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারে না। কারণ তার পণ্য কেনার মতো সামর্থ্য থাকে না। কাজেই পণ্যের দাম কমলেই যে তা সব সময় ভালো হয় তা কিন্তু নয়। করোনা ও অন্যান্য কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু চাহিদা সমানুপাতিক হারে কমেনি। তাই চাহিদা ও উৎপাদন একই সঙ্গে না কমার ফলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। 

বিশেষ কারণে মাত্র কোনো একটি পণ্যের দাম বাড়লে-কমলে তাকে আমরা মূল্যস্ফীতির মধ্যে গণ্য করি না। যেমন—আকাশে মেঘের কারণে আইসক্রিমের দাম কমে গেছে। অথবা মেঘের কারণে ছাতার দাম বেড়েছে—এটা মূল্যস্ফীতির মধ্যে পড়ে না। কারণ এটা সাময়িক এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির একটি ম্যাক্রো ইভেন্ট। বর্তমানে দেশে যে ধরনের মূল্যস্ফীতি প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, অর্থনীতিবিদগণ তার নাম দিয়েছেন কস্ট পুশ ইনফ্লেশন। উৎপাদন কম, সরবরাহের তুলনায় চাহিদা বেশি—এ কারণে যে মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়, তাকে ডিম্যান্ড পুল ইনফ্লেশন বলা হয়। প্রথম দিকে করোনার সময়ে যে মূল্যস্ফীতি আমরা প্রত্যক্ষ করি, তা ছিল মূলত এ ধরনের ইনফ্লেশন। তবে এখন যে মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তা হলো কস্ট পুশ ইনফ্লেশন। তাই শুধু কন্টাকশনারি  (সংকোচনশীল) পলিসি দিয়ে একে অবদমন করা যাবে না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদহার গত এক বছরে অন্তত সাত বার বাড়িয়েছে। এতে দেশটির ব্যাংক ঋণের সুদের হার অনেক বেড়েছে। ফলে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে তারা মূল্যস্ফীতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও গত ছয় মাসে অন্তত তিন দফায় নীতি সুদহার ১ শতাংশ বাড়িয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ তুলে দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক হয়তো মনে করছে, দেশে বর্তমানে ডিমান্ড পুল ইনফ্লেশন চলছে। কাজেই বিনিয়োগের জন্য বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে পারলে এবং বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে। বাজারে বিনিয়োগ অর্থের জোগান বাড়াতে হলে টার্ম ঋণের প্রয়োজন হবে। আর টার্ম ঋণের সুদের হার কমিয়ে ঋণ গ্রহণকে সস্তা ও সহজীকরণ করতে হবে। এটা হলো মন্দাক্রান্ত অর্থনীতির ওষুধ। এটাকে বলা হয় সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি। কাজেই সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতিতে সুদের হার বাড়ানোর কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ঠিক সেই কাজই করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ এবং আমানতের ওপর প্রদেয় সর্বোচ্চ সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। তার পরও আমানতকারীরা ব্যাংকে আমানত রাখছেন। নতুন মুদ্রানীতিতে আমানতের ওপর প্রদেয় সুদের সর্বোচ্চ হার তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের আপার ক্যাপ বহাল রাখা হয়েছে। 

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক থেকে কিছু মানুষ তাদের আমানত প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তার পেছনে অবশ্য অন্য কারণ আছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে একধরনের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ আমানতকারীদের অনেকেই তাদের সঞ্চিত আমানত উত্তোলন করে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে রাখছেন। যদিও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে আমানতের ওপর দশমিক ৫০ শতাংশ কম সুদ দেওয়া হয়। এটা সুদের কোনো ইস্যু নয়। ইস্যুটি নিরাপত্তাজনিত। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়াচ্ছে। আমরা যদি আমানতকারীদের তুলনামূলক কম সুদ প্রদান করি, তাহলে তারা স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে মার্কিন ডলারে পরিবর্তন করে বিদেশে যেখানে সুদের হার বেশি পাবে, সেখানে সঞ্চয় করবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কম থাকলে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবেন। এতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ ও জিডিপি গ্রোথ হতে পারে। আবার আমানেতর ওপর কম সুদ দেওয়া হলে উদ্বৃত্ত অর্থের মালিকেরা তাদের অর্থ ব্যাংকে সঞ্চিত রাখার ক্ষেত্রে নিরুত্সাহিত হতে পারেন। আমানতের ওপর তুলনামূলক কম সুদ দেওয়া হলে অর্থ পাচারও বেড়ে যেতে পারে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: এম এ খালেক