বিপজ্জনক দূষণের কবলে আমরা

সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা সংস্থা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের সব শহরকে টপকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেছে। এই খবর বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচারিত হয়েছে এবং অনেকেই জেনেছেন। এখন হয়তো অনেকেই বলবেন, এই খবর নতুন কিছু নয়। ঢাকা সব সময়ই বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে থাকবে। এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। অতএব এই নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।

না, এবার কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার মতো খবর নয়। মানুষের মন-মগজকে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকুনিতে ফেলে দিয়েছে। কারণ ঢাকা দূষিত শহর হিসেবে অনেক বেশি; অর্থাৎ ২৭৬ স্কোর নিয়ে খুবই অস্বাস্থ্যকর আখ্যায়িত হয়ে প্রথম হয়েছে। তাই আগের মতো এবারও যদি তাই রে নাই রে হেলেদুলে অবজ্ঞা করা হয়, তাহলে দেশে মহাবিপর্যয় ঘটবে, এটা নিশ্চিত। 

এখানে বায়ু পরিমাপের একটি পরিসংখ্যান দেওয়া যেতে পারে। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে যে, আসলেই খুব খারাপ খবর দেশের জন্য। মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বায়ু পরিমাপের সূচকে শূন্য থেকে ৫০ পর্যন্ত ভালো। ৫১-১০০ মোটামুটি ভালো। ১০১-১৫০ পর্যন্ত সতর্কতামূলক। ১৫০-২০০-এর মধ্যে থাকলে অস্বাস্থ্যকর বলে চিহ্নিত করা হয়। ২০১-৩০০-এর মধ্যে থাকলে (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) একিউআই মাত্রাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর বলা হয়। আর ৩০১-এর বেশি স্কোরকে বলা হয় বিপজ্জনক। উক্ত পরিসংখ্যানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজধানী আমাদের প্রাণের ঢাকা শহর বায়ু পরিমাপের সূচকে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছতে খুব বেশি একটা দূরে নেই। অথচ কী আশ্চর্য, এই বিষয় নিয়ে কাউকে ছটফট করতে দেখা যাচ্ছে না! একেবারে চুপচাপ। তাহলে কি খুবই অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক আবহাওয়ার ভেতরেই আমাদের থাকতে হবে? নাকি বসবাস উপযোগী পরিবেশের দরকার নেই। কোনটা? 

ঢাকা শহর ছোট হলেও মানুষ আর মানুষে কিলবিল করছে। প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস। কিলবিল তো করবেই। 

এক বর্গকিলোমিটারে বসবাস করেন ৭০০ থেকে ৮০০ জন, যা এলাকাভেদে আরো বেশি। আন্তর্জাতিক মান হচ্ছে—এক বর্গকিলোমিটারে ৭০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ জন পর্যন্ত হতে পারে। কোথায় ১০০ জন আর কোথায় ৮০০ জন—আকাশপাতাল ব্যবধান! মোটকথা, ঢাকা শহর ঘিঞ্জি ভাগাড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। একে তো অবিশ্বাস্য রকম বেশি মানুষ, তার ওপর আবার খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অর্থাৎ মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যেখানে প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস, সেখানে ভাগাড়ে অবস্থা তৈরি হলো কেন? এর উত্তরে চারটি কারণের কথা বলা যেতে পারে; ১) ইটভাটা; ২) কনস্ট্রাকশন কাজে মাটি, ইট, বালি সিমেন্ট; ৩) রাস্তার সংস্কার কাজের ধুলোবালি; ৪) যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও অতিরিক্ত ট্রাফিক কনজেশন। এই চারটি কার্যক্রমে বায়ুদূষণ এবং ভাগাড়ে পরিণত হওয়ার মূল উৎস। রাস্তার ওপরের অংশে সর্বক্ষণ ধুলোবালিতে ঘন কুয়াশার মতো ভেসে থাকে। অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা অবিরত গাড়ির চাকার ঘর্ষণে বাতাসে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে মানুষজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রাস্তায় চলতে ফিরতে কখন যে মস্তিষ্কের ক্রিয়াকর্ম হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে শরীর তা জানে না। অনেকে ভাবতে পারেন, খুবই অস্বাস্থ্যকর বিপজ্জনক দূষিত বায়ু, এটা আবার কী? মানুষ জানবে কী করে? অস্বাস্থ্যকর ভাগাড়ে পরিবেশের মধ্যে থেকে থেকে যে শরীর মন মগজে পোকা ধরে স্ট্যামিনা নষ্ট হয়ে গেছে! কর্মস্পৃহাকে জাগিয়ে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছে না। সব মানুষের মধ্যে কেমন যেন অল্প পরিশ্রমের কাজের প্রতি প্রবণতা বাসা বেঁধে ফেলেছে।

আমাদের সমাজ-জীবনে এই উদ্ভট কার্যক্রম চলছে বহুদিন যাবৎ। দেখা যায় সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি উদ্যোগে বিল্ডিং ইমারত ও সংস্কারকাজগুলো করতে গিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নির্বিঘ্ন্নে চলাচল বজায় না রাখা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক আইনকানুন দেখভালের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। তাহলে এসব কাজের দরুন আবহাওয়া ও পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে মানুষজন দুর্ভোগে পড়ছে, শারীরিক মানসিক ক্ষতি হচ্ছে, এটা কোন প্রশাসন দেখবে ?

পরিশেষে সম্প্রতি বার্ষিক জেলা প্রশাসক সম্মেলনের সমাপ্তি ২০২৩ নিয়ে কিছু কথা এখানে না বললেই নয়। এবারের জেলা প্রশাসক সম্মেলন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মিডিয়া মারফত জানা যায়, উক্ত সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২৫ দফা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন দাবির কথা উত্থাপিত হয়েছে। এই জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে টিলাকাটা, বনউজাড়, গাছকাটা, মাটিকাটা, অবৈধ ইটভাটা, ভাটায় গাছ পোড়ানো, পলিথিন প্লাস্টিকের ব্যবহার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা এখনো কিছু প্রত্যক্ষ করতে পারিনি। 

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা