বই না পড়েই সবজান্তা

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি বই পড়েন না। একটা আস্ত বই কোনো দিন পড়েননি তিনি। তার সময় হয়নি। বই পড়ার ক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পই আমাদের আদর্শ হতে চলেছে। বই পড়ার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে কমে যাচ্ছে এবং আমরা ক্রমেই বই পড়া থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। এমনিতেই জাতি হিসেবে বই পড়ার ব্যাপারে আমাদের প্রবল অনীহা। আমাদের পারিবারিক জীবনেও বই পড়ার ব্যাপারে অনুকূল পরিবেশ নেই। অভিভাবকেরা বই পড়তে নিরুত্সাহিত করেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বইকে বলা হয় ‘বাজে’ বই। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষ কেবল পরীক্ষায় পাশ ও চাকরি পাওয়ার জন্য বই পড়ে থাকে। এর বাইরে স্বেচ্ছায় মনের আনন্দে কেউ বই পড়তে চায় না। বই পড়ার সময়ও কারো নেই। 

এখন বইয়ের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হচ্ছে স্মার্ট ফোন। আরো স্পষ্ট করে বললে ফেসবুক। শয়নে-স্বপনে-জাগরণে-রেস্টুরেন্টে-টয়লেটে সবারই চোখ মোবাইল ফোনে। পারস্পরিক কথা বিনিময় কম হয়। সবাই ফেসবুকে আপডেট দেখতে ব্যস্ত। 
তার পরও প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলার আয়োজন করা হয়। মেলা উপলক্ষ্যে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়। বইমেলা ঘিরে প্রচুর লোকসমাগম ঘটে। বইমেলায় ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে ওঠে। তবে এত মানুষ সমাগমের পরেও বইয়ের কাঙ্ক্ষিত কাটতি নেই।

আমাদের জীবনে সব হয়, শুধু হয় না পড়া। তার পরও কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তি বই কেনেন। বইমেলায় কোটি কোটি টাকার বই বিক্রি হয়। তবে যারা বই কেনেন, তাদের সবাই বই পড়েন না। বই নিয়ে নানা জনের নানা অভিজ্ঞতা। কেউ কেউ বই কেনেন সাজিয়ে রাখার জন্য। ড্রইংরুমের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য। কয়েকটা মোটা বই আলমারির র‍্যাকে সুন্দর করে সাজিয়ে না রাখলে নিজের আভিজাত্য প্রমাণ করা যায় না। যদিও সেই বই সংশ্লিষ্টরা নিজেও পড়েন না, কাউকে ছুঁতেও দেন না! 

মানুষ বই কেনেন না, পড়েন না, তার পরও প্রতি বছর হাজার হাজার বই প্রকাশ হয় কেন? আমাদের সমাজে রয়েছে বইয়ের বহুবিধ ব্যবহার। ঠোঙা বানানো, চানাচুর-বাদাম, পান বিক্রির কাজে পুরোনো ও বাতিল বইয়ের পৃষ্ঠা অনাদিকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমি এমন অনেক অলস ব্যক্তিকে দেখেছি, যিনি গল্পের বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সেটিকে মুড়িয়ে কান চুলকানোর কাজে ব্যবহার করেন। আবার এমন অনেক সৃজনশীল গৃহিণীকে দেখেছি, যারা বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে এক চুলা থেকে আরেক চুলায় আগুন ধরান! আমরা ছোটবেলায় ভাইবোনেরা যখন ঝগড়া করতাম, তখন বড়রা বইকে ডান্ডা হিসেবে ব্যবহার করতেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষে করে আমরা যখন দল বেঁধে মেসে থাকতাম, তখন প্রায় প্রতি রাতেই কিছু ভবঘুরে বন্ধু অনিচ্ছুক অতিথি হতো। তখন মেঝেতে শোয়ার সময় লুঙ্গি বিছানার চাদর হিসেবে ব্যবহার করা হতো আর রবীন্দ্র রচনাবলি, বঙ্গীয় শব্দকোষ জাতীয় ঢাউস সাইজের বইগুলো বালিশ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। যখন মোবাইল ফোন, টিভির রমরমা ছিল না, তখন দেখেছি অনেক মা বাচ্চা-কাচ্চার কান্না থামানোর জন্য বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস-কবিতার বই তাদের সামনে দিয়ে বসিয়ে দিতেন। আর বাচ্চারা মনের আনন্দে বই ছিঁড়ত। বাচ্চারা কিন্তু এখনো বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়তে ভীষণ পছন্দ করে।       

তবে যারা বই লেখেন, বই প্রকাশের চেষ্টা করেন, তারা কিন্তু অতশত ভেবে তা করেন না। একজন তরুণ কবিকে জানি, যিনি একজন প্রকাশকের কাছে গিয়েছিলেন। প্রকাশককে গিয়ে কবি বলছেন :কিছু দুর্দান্ত কবিতা লিখে এনেছি, একটা বই যদি প্রকাশ করতেন।

প্রকাশক :বিয়ে করেছেন?

: না।

: বিয়ে করে তারপর আসেন।

:কেন?

:আপনার বইয়ের অন্তত একজন পাঠক তো চাই! 

বই নিয়ে গোটা দুনিয়াতেই অনেক কাহিনি প্রচলিত আছে। ফ্রান্সের বরেণ্য সাহিত্যিক আলেকজান্ডার দুমা একবার রাশিয়ার টিফলিস শহরে বেড়াতে গিয়ে একটা বইয়ের মার্কেটে গেলেন। সেই মার্কেটের এক দোকানদার খবর পেয়ে দুমাকে খুশি করার জন্য তার দোকান শুধু দুমার বই দিয়ে ভরে ফেললেন।

দুমা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার, অন্য সাহিত্যিকদের বই কোথায়?

: অন্যদের বই! অন্যদের সমস্ত বই বিক্রি হয়ে গেছে!

অনেকে বলেন, বউ আর বইয়ের বিরোধ রয়েছে। এ ব্যাপারে যদিও কোনো গবেষণা নেই। আমার ধারণা, নারীবিদ্বেষী ব্যক্তিরা এমন একটা কথা দুনিয়া জুড়ে রটিয়েছে। আমি নিজে যা বুঝি তা হলো: বউ নিজে নিজেই আপনাকে ছেড়ে যেতে পারে। কিন্তু বই কখনো আপনাকে ছেড়ে যাবে না, যদি কেউ তাকে চুরি করে নিয়ে না যায়! 

বই নিয়ে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ট্রেনে এক হকার বই বিক্রি করছেন। 

হকার একজন যাত্রীর উদ্দেশে বললেন, ভাই, দেব নাকি একখানা বই? খুব ভালো বই, কাজের বই। বইয়ের নাম ‘চুরি করলে ধরা পড়বেন না’। এই বইটা পড়ে দেখুন, চুরি করে ধরা না পড়ার সমস্ত নিয়ম আছে। খুব সহজেই আপনি কৌশল আয়ত্ত করতে পারবেন। মনে করুন আপনার পকেটে কিছু আছে। বলেই তিনি ঐ যাত্রীকে বললেন, ভাই আপনার পকেটে কী আছে, একটু বলুন। 

যাত্রীটি বলল, মানি ব্যাগে ৫০০ টাকা আছে। 

এরপর ঐ হকার যাত্রীটির পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগটি বের করে ফেললেন। এরপর বললেন, এবার আমার দিকে লক্ষ করুন, এই নিলাম (বলেই, হকার চলন্ত ট্রেন থেকে নিচে লাফ দিল।)। দেখলেন তো কীভাবে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিলাম, তবে এই কাজটি করতে হবে অত্যন্ত সাবধানে।

যাত্রীটি এবার চিৎকার করে বললেন, এই মিয়া করো কী, আমার মানি ব্যাগটা...।

হকার : (হাসতে হাসতে) ধরতে পারবেন না, ভাই। সব নিয়মাবলি বইটায় দেওয়া আছে। মনে রাখবেন, না বলেই নিতে হয় এবং কাজটা আকস্মিক করতে হয়! 

তবে এ ধরনের ঘটনা সব সময় ঘটে না। সবার ক্ষেত্রেও ঘটে না। বই কেনা নিয়েও অনেক ক্রেতার বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এক ক্রেতা বইয়ের দোকানে গিয়ে বই দেখছেন। একটি চমৎকার প্রচ্ছদের বইয়ে পাঠকটির দৃষ্টি আটকে গেল।

বই বিক্রেতা ক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই বইটা পড়লে হাসতে হাসতে মারা যাবেন।

ক্রেতা :তাহলে এক কপি দিন। আমার বসকে পড়তে দেব!

অপর এক ক্রেতার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। বইমেলায় এক স্টলে ঢুকে কিছু বই চাইলেন এক ভদ্রলোক। বিক্রেতা জানতে চাইলেন, কী রকম বই চাই, বলুন। হালকা কিছু?

জবাবে ভদ্রলোক বললেন, না না, ওজন নিয়ে আপনি মোটেও ভাববেন না। আমার সঙ্গে গাড়ি আছে।

বইয়ের গুরুত্বও সবার কাছে সমান নয়। এক অফিসের বস অফিসে বসেই সাহিত্য রচনা করতেন। তার এক অধস্তন সহকর্মী একদিন বসকে গিয়ে বললেন, স্যার, আপনি সারাক্ষণ এত মনোযোগ দিয়ে কী লেখেন? 

বস বললেন, গল্প-উপন্যাস লিখি।

এবার অধস্তন কর্মীটি বললেন, এত কষ্ট করে লেখার দরকার কী? কয়টা টাকা খরচ করলে তো বাজার থেকেই এগুলো কিনতে পারেন। 

বই নিয়ে গল্প-কৌতুকের কোনো শেষ নেই। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের পাঠাভ্যাস নিয়ে একসময় বাজারে একটি গল্প খুব প্রচলিত ছিল। জর্জ বুশের হোয়াইট হাউজ ত্যাগের সময় তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পরিবহনের জন্য ট্রাক এলো। প্রেসিডেন্টদের অনেক বই থাকে। ফলে বড় ট্রাকই বরাদ্দ। কিন্তু মাল পরিবহনের লোকজন বুশের স্টাডি রুমে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। পুরো স্টাডিরুমে পড়ে আছে শুধু দুখানা বই। একটা স্পোর্টস ম্যাগাজিন আর এক কপি হাসলার! 

তবে সবাই বুশের মতো নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক রাজনীতিক আছেন, যাদের প্রজ্ঞা, বিদ্যা ও জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সাধারণভাবে রাষ্ট্রনায়কদের কাছে প্রজ্ঞা ও দার্শনিকতা প্রত্যাশা করা হয়। প্লেটো বলেছিলেন, তার আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান হবেন একজন দার্শনিক রাজা। বলেছিলেন, দার্শনিকদেরই রাজা হতে হবে কিংবা রাজাকে দার্শনিক হয়ে উঠতে হবে। এখন যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তারা কোনো রকম লেখাপড়া ছাড়াই একেকজন ‘জ্ঞানী ও দার্শনিক’। আবার নাগরিকেরাও এখন কোনো রকম পঠনপাঠনের অভ্যাস ছাড়াই একেকজন পণ্ডিত ও দার্শনিক। ‘বুক’ নয়, ‘ফেসবুক’ পড়েই, ফেসবুকে লিখেই সবাই ‘সবজান্তা শমসের’ সেজে বসে আছেন। 

এই ‘সবজান্তা শমসের’দের অগ্রযাত্রা রুখবে, তার সাধ্য কার?

লেখক : রম্যরচয়িতা