বইমেলায় ছুটির দিনে চিরচেনা জনস্রোত

ভিড়ের তুলনায় বিক্রি কম

কী কী বই কিনেছ? প্রশ্ন করতেই শতকণ্ঠের চিৎকারে শোনা গেল না কিছুই। বইমেলায় আসার, নতুন নতুন বই কেনার আনন্দে শিশু-কিশোরদের চোখে খুশির ঝিলিক। সেটাই জানান দিল শতকণ্ঠের মিলিত চিৎকারে। গতকাল সকালে ‘শিশুপ্রহরে’ মেলায় শিশুরা এসেছিল দল বেঁধে। অভিভাবকেরা বললেন, ‘শুধু লেখাপড়া নয়, আমাদের শিশুদের সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের চেতনায় লালিত এই বইমেলাকে পরিচিত করে তুলতে চাই। সে কারণেই আজ আসা। শিক্ষার্থীরা মেলায় এসে বইমেলা, বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানবে। শুধু বই পড়ে জানার চেয়ে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে এলে তারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারবে। সেটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি।’

গতকাল মেলায় এসেছিলেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘আমার লেখকজীবনের শুরু থেকেই শিশুদের নিয়ে লিখি। এখন আমার কাজের সূত্রেই শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল আমাকে বলেছিলেন, ‘শিশু-কিশোরদের পাঠক হিসেবে পাওয়াটা অন্যরকম আনন্দের ব্যাপার। কারণ, শিশুরা সব সময় সত্যি কথা বলে। যদি লেখা খারাপ হয়, তাহলে শিশুরা বলে দেবে আপনার লেখা পচা। আর যদি লেখা ভালো হয়, তাহলে ওরা মন থেকেই প্রশংসা করে। এটা আমি অনুভব করতে পারি। তাছাড়া, আমার মেয়ে পদ্য শিশু বয়সেই পড়াশোনা করতে বিদেশে চলে যায়। এরপর যে শিশুকেই দেখি, আমার নিজের মেয়ের কথা মনে হয়। আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি।’

ছবি: ফোকাস বাংলা

এদিকে, গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বইমেলা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সেই চিরচেনা জনস্রোত। প্রবেশপথগুলোতে মানুষের দীর্ঘ সারি। বইমেলা প্রাঙ্গণ ভরে উঠেছে মানুষের পদচারণায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এত বড় মেলা প্রাঙ্গণকেও কাল ছোট মনে হয়েছে। মনে হয়েছে আরও জায়গা প্রয়োজন। ছুটির দিনে মেলায় এসেছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, মশিউল আলম, রফিকুর রশীদ, মোহিত কামাল প্রমুখ। সারাক্ষণই তারা ব্যস্ত ছিলেন অটোগ্রাফ দিতে আর পাঠকদের সঙ্গে সেলফি তুলতে।

মেলায় ভিড়ের তুলনায় বিক্রি কম

প্রকাশকেরা জানাচ্ছেন, যত মানুষ মেলায় আসছে, সেই তুলনায় বিক্রি কম। শোভা প্রকাশের মিজানুর রহমান বলেন, যত মানুষ আসছে, সেই তুলনায় বিক্রি কম। এবার ১০০টির বেশি বইয়ের প্রস্তুতি ছিল, কিন্তু মেলা উপলক্ষে নতুন বই এনেছি মাত্র ছয়টি। এর কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কাগজের দাম এতটাই বেড়েছে যে বইয়ের যা দাম হয় তা পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যায়।

ছবি: ফোকাস বাংলা

ঐতিহ্য প্রকাশনীর প্রকাশক আরিফুর রহমান নাঈম বলেন, কাগজের দাম বেশি। তবে আমি বই বেশি প্রকাশ করেছি। তিনি জানান, গত বছর ১০৬টি বই প্রকাশ করেছিলাম। এ বছর মেলায় ২১১টি বই এনেছি। আর নতুন নতুন বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছি। বইগুলো ছোট কলেবরের। ফলে কেনার সময় পাঠকের ওপরে চাপ হবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবসাকে গতিশীল রাখতে হলে তো বিক্রি বাড়াতে হবে। সে কারণেই আমরা এবার বেশি বই এনেছি। আজ শনিবারও শিশুপ্রহর। বেলা ১১টায় শুরু হবে বইমেলা।

নতুন বই :গতকাল মেলায় এসেছে ২৭৬টি নতুন বই। এর মধ্যে অনুপম প্রকাশনী এনেছে অভীক রায়ের ‘উপমহাদেশে গণিতের ইতিহাস ইতিহাসের গণিত’, ধ্রুব এষের ‘মনে রাখবো’, নবরাগ এনেছে আহসান হাবীবের ‘গল্পের জাদুকর’, গ্রন্থকুটির এনেছে সেলিনা হোসেনের ‘সাগর’, বিভাস এনেছে ওবায়েদ আকাশের ‘নির্বাচিত ২০০ কবিতা’, নাগরী এনেছে আন্দালিব রাশদীর ‘সাবলেট’, আইডিয়া প্রকাশন এনেছে দীপু মাহমুদের ‘নরকের কালো মেঘ’, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স এনেছে ‘পাপড়ি রহমানের ‘আমার একলা পথের সাথি’, চন্দ্রাবতী একাডেমি এনেছে ‘মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘বাংলাদেশের কবিতা: সন্ধান ও অনুসন্ধান’ প্রভৃতি।

ছবি: ফোকাস বাংলা

শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা :বইমেলার মূল মঞ্চে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। ক-শাখায় প্রথম হয়েছেন আরোহী বর্ণমালা, দ্বিতীয় হয়েছেন অংকিতা সাহা রুদ্র এবং তৃতীয় হয়েছেন জুমানা হোসেন। খ-শাখায় প্রথম হয়েছেন সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ, দ্বিতীয় হয়েছেন আনিশা আমিন এবং তৃতীয় হয়েছেন অদ্রিতা ভদ্র এবং গ-শাখায় প্রথম হয়েছেন আদিবা সুলতানা, দ্বিতীয় হয়েছেন তাজকিয়া তাহরীম শাশা এবং তৃতীয় হয়েছেন সিমরিন শাহিন রূপকথা।

মূল মঞ্চে আলোচনা :বিকেলে বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবার্ষিক শ্রদ্ধাঞ্জলি :সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মহীবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অনিরুদ্ধ কাহালি ও মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ আকরম হোসেন।

সৈয়দ আকরম হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্যকে বিচার করা এখন সময়ের দাবি। তার সাহিত্য বিশ্লেষণে তত্ত্বের শৈল্পিক ও নান্দনিক ব্যবহারের দিকে আমাদের মনোযোগী হতে হবে। 

গতকাল লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন মাসুদুজ্জামান, ভাগ্যধন বড়ুয়া, ম্যারিনা নাসরিন ও ইউসুফ মুহম্মদ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন ফরিদ আহমদ দুলাল, ফেরদৌস নাহার, তপন বাগচী, জাহিদ মুস্তাফা, আফরোজা সোমা ও আশরাফ জুয়েল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী সুকান্ত গুপ্ত, রুবিনা আজাদ ও মো. শওকত আলী। এছাড়া ছিল ফরিদ আহমদ দুলাল রচিত এবং নাট্যাঙ্গন নাট্যপরিবার নিবেদিত নাটক ‘উন্মোচন রহস্য’ এবং রুবিনা আজাদের পরিচালনায় ‘উদয় দিগঙ্গন’-এর শিল্পীদের পরিবেশনা।