ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তি নিয়ে সংশয়

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর কেবল রাশিয়া কিংবা ইউক্রেনেরই ক্ষতি হচ্ছে না, ইউরোপ আমেরিকাসহ সারা বিশ্বকে এই যুদ্ধের ফল ভোগ করতে হচ্ছে। বিশ্বের অর্থনীতি সংকুচিত হচ্ছে, মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং দেশে দেশে খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার ওপর ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েও পিছু হটানো যাচ্ছে না। ফলে বিশ্ব নেতৃত্বও চিন্তায় পড়েছে যুদ্ধ বন্ধের কৌশল নিয়ে।

ইউক্রেন

রাশিয়ার লক্ষ্য অনেক : যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যাতে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হয়। এ বিষয়ে লিখিত চুক্তি করলেই রাশিয়া সামরিক অভিযান বন্ধ করবে বলেই জানিয়েছিল রাশিয়ার শীর্ষ নেতৃত্ব। এরপর পূর্ব ইউক্রেন তথা দনবাস অঞ্চল (ইউক্রেনের হৃদপিণ্ড হিসেবে খ্যাত) দখল করার অভিপ্রায় জানিয়েছিল। এরপর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন যে, আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্কোর লক্ষ্য দক্ষিণ খেরসন এবং জাপোরিঝিয়া অঞ্চলগুলোকে এবং আরও কয়েকটি অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করতে। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ইউক্রেনের বর্তমান শাসকদের কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। রাশিয়া ইউক্রেনকে বর্তমান শাসকদের হাত থেকে উদ্ধার করবে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার সাঁজোয়া যান।

ল্যাভরভ বলেছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মানুষ একসঙ্গে শান্তিতে থাকবেন। আমরা ইউক্রেনের মানুষদের বর্তমান শাসকদের সরানোর জন্য সাহায্য করব। কারণ, এই শাসকরা শুধু জনগণের বিরোধী তা-ই নয়, তারা ইতিহাসবিরোধী। পশ্চিমা দেশগুলো অবশ্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলনস্কির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তারা মনে করছে, জেলেনস্কি যেভাবে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, তা প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু ল্যাভরভ বলেছেন, জেলেনস্কি এবং পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে রাশিয়ার চিরশত্রু বানাতে চাইছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, তারা শাসক পরিবর্তন করতে চায় না।

বিমান হামলা থেকে বাচতে ইউক্রেনের ইরপিন শহরের সেতুর নীচে অবস্থান নিয়েছে সাধারণ মানুষ।

কিসিঞ্জারের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা: গত বছরের মে মাসে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে হেনরি কিসিঞ্জার ইউক্রেনে রাশিয়ার জন্য বিব্রতকর পরাজয় না চাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি আহ্বান জানান। এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, এতে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অবনতি ঘটাতে পারে। তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর ইউরোপের প্রতি রাশিয়ার গুরুত্বের কথা মনে রাখা উচিত এবং ‘মুহূর্তের মোহে’ ভেসে যাওয়া উচিত নয়। এ সময় রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ‘পূর্বতন স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস ক্যু)’ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে আলোচনায় বসার জন্য ইউক্রেনকে চাপ দিতে পশ্চিমাদের প্রতি আহ্বান জানান কিসিঞ্জার। যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইউক্রেনের রাশিয়ার কাছে নিজের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। যদিও পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনায় থাকা কিসিঞ্জার সুর উলটে দেন।

ইউক্রেনের সুমিতে বিমান হামলা।

সম্প্রতি কিসিঞ্জার জার্মান পাবলিক ব্রডকাস্টার জেডডিএফকে বলেন, ইউক্রেনের ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে এবং কোন পরিস্থিতি আলোচনার জন্য নয়, সে সম্পর্কে পশ্চিমাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। কিসিঞ্জারের এমন পরামর্শের দিন কয়েক দিন আগে গত বছরের ১৯ মে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে একটি মতামত প্রকাশ করে। এতে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইউক্রেনকে বেদনাদায়ক আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ শান্তির লক্ষ্যে ইউক্রেনকে তার নিজ ভূখণ্ড রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিতে হবে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড লেখে, শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের জনগণকেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, তারাই রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে, মরছে ও ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। এ যুদ্ধের শেষ কেমন হবে, সে ব্যাপারে তাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপসের স্বার্থে ইউক্রেনের নেতাদের বেদনাদায়ক আঞ্চলিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

রুশ হামলায় বিধ্বস্ত ইউক্রেনের শিশু হাসপাতাল

ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞায়ও পিছু হটছে না রাশিয়া : ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ছয়টি নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ গ্রহণ করেছে। রাশিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অর্থনৈতিক লেনদেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। খাদ্য, ফসল এবং কিছু সার যা নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের মতে, ইইউ যা ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ, বেশ কয়েকটি শীর্ষ অলিগার্চ এবং ১০৮টি প্রতিষ্ঠানসহ ১ হাজার ২১২ ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞাগুলো প্রযোজ্য। রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্ধেক ফ্রিজ করা হয়েছে এবং রাশিয়ান ব্যাংকগুলোকে সুইফট আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ইইউ প্রযুক্তি, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস এবং বিলাসবহুল পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১ হাজারেরও বেশি পশ্চিমা কোম্পানি রাশিয়া থেকে প্রত্যাহার করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিষেধাজ্ঞার লাইভ ট্র্যাকারে, জার্মান অলাভজনক তদন্তকারী একটি সংস্থা দেখতে পেয়েছে যে, এর আগে কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে এত নিষেধাজ্ঞা আর কখনো হয়নি। দুই পক্ষ জয়ী হওয়ার অবস্থানে অনঢ় থাকায় যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত করে কোনো বিশেষজ্ঞ বলতে পারছেন না।