স্মার্ট ভিলেজ ও স্মার্ট সিটি গঠন প্রসঙ্গে

‘স্মার্ট ভিলেজ’। দেশের প্রথম ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হিজলী গ্রাম। জেলাশহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে গ্রামটি। ঝিনাইদহ জেলার হরিনাকুণ্ডু উপজেলার কাপাশহাটিয়া ইউনিয়নের বাওড় পাড়ে এই হিজলী গ্রামের অবস্থান। গ্রামের প্রবেশপথে লাগানো হয়েছে সুন্দর একটি বোর্ড যেখানে লেখা আছে—স্বাগতম, স্মার্ট ভিলেজ হিজলী। ৩৩৪টি পরিবার রয়েছে হিজলী গ্রামে, যার মধ্যে ৪৯৩ জন পুরুষ ও ৫১৯ জন নারীর বসবাস। এই গ্রামের ২৩৯ জন পুরুষ এবং ২৬৮ জন নারী লিখতে পড়তে পারেন। যে গ্রামের মাত্র দুই জন নারী ও দুই জন পুরুষ চাকরি করেন। কৃষি কাজই গ্রামের মানুষের মূল পেশা। সব মিলিয়ে  বলতে গেলে পিছিয়ে পড়া একটি গ্রাম হিজলী।

হিজলী গ্রাম এখন বাল্য বিবাহমুক্ত, অপরাধমুক্ত, আত্মহত্যামুক্ত, স্বনির্ভর, ডিজিটাল এবং পরিবেশবান্ধব। এখানে করা হয়েছে একটি স্মার্ট বৈঠকখানা, যেখানে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে প্রতি সপ্তাহে এক দিন করে গ্রামবাসীদের সমস্যা শোনা হয় এবং তার সমাধান দেওয়া হয়। নিকট অতীতের তথ্য থেকে জানা যায়, হিজলী গ্রাম এক সময় ছিল সন্ত্রাসীদের আখড়া, বসবাসরত মানুষের সঙ্গে উন্নয়নের স্রোতধারার সম্পৃক্ততা ছিল না । বর্তমান সরকারের ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের ছোঁয়ায় এই ভীতি, কুসংস্কার এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদ আলোর মুখ দেখছে। এক সময় আত্মহত্যার প্রবণতা, মাদকাসক্ত, স্মার্ট ফোনের যথেচ্ছচার অপপ্রয়োগসহ সুদে কারবারীর মরণফাঁদে পড়ে হাঁপিয়ে ওঠে এখানকার জনজীবন। স্মার্ট ভিলেজ করার পর জীবন যাত্রার মানোন্নয়নসহ আমূল পরিবর্তন ঘটেছে  হিজলী গ্রামবাসীর।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিজলী গ্রামটিকে স্মার্ট ভিলেজে বা মডেল করার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ১০টি বিশেষ উদ্যোগকে বাস্তবায়নের জন্য একটি প্রটোকল তৈরি করেছে, যা অনুসরণ করে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের কাজ চলছে। যার মধ্যে রয়েছে গ্রামটিতে ক্ষুদ্র কুটির হস্তশিল্পের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করে গ্রামবাসীদের বিশেষ করে নারীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং অফলাইন-অনলাইন উভয় ক্ষেত্রেই বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ করা, ইন্টারনেট সংযোগ শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধিকরণ, চাষযোগ্য জমি, বিশেষ করে বাড়ির আঙিনার অনাবাদি জমিসহ শত ভাগ জমিকে চাষের আওতায় এনে দেশের উৎপাদনশীলতাকে ত্বরান্বিত করা, বাল্য বিয়ে বন্ধ করার মাধ্যমে মাতৃস্বাস্থ্যের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশ্চিতকরণ।  তাছাড়া কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিশেষ করে যুবক শ্রেণির কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা, ঝরে পড়া, অটিস্টিক এবং এতিম বাচ্চাসহ সব শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা, সন্ত্রাস, নেশা এবং মোবাইল আসক্তি থেকে কিশোর-কিশোরীদের দূরে রাখা, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে সরকারি অফিসসমূহকে সেবাগ্রহীতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং রিনিউবল শক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই পরিবেশ নিশ্চিতকরণ করে স্মার্ট ভিলেজের ধারণা দেওয়া। এছাড়া এখানকার মানুষকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের স্বাদ দিতে একটি আধুনিক এবং নিজস্বতায় সমৃদ্ধ সমাজ ও প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশ স্বপ্নের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের চিন্তা থেকেই এই হিজলী গ্রামকে স্মার্ট ভিলেজ করার উদ্যোগ।

স্মার্ট ভিলেজ করার কারণে এই গ্রামে এখন তিনটি বাড়িতে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। জাপানি দাতা সংস্থা জাইকা প্রকল্পের সহায়তায় পাঁচটি সোলার স্ট্রিট লাইট স্থাপন, গ্রামের নামে ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়েছে, গ্রামের ৭০ শতক জমিতে পারিবারিক পুষ্টির বাগান স্থাপন করা হয়েছে, যেখান থেকে নিয়মিত নিরাপদ বিষমুক্ত সবজি উৎপাদন হচ্ছে এবং ২০টি বাড়িতে রান্নাঘরের আবর্জনা দিয়ে জৈবসার তৈরি করা হচ্ছে। মৃদু প্রতিবন্ধীদের মধ্যে থেকে তিন জনকে মাশরুম চাষের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ৯ জনকে আউটসোর্সিং কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, স্মার্ট ভিলেজ হিজলীতে ইন্টারনেট সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, গর্ভবতী মায়েদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং তাদের কাউন্সিলিং করা হচ্ছে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। গ্রামের ২০২টি টিউবওয়েল আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছে। যুবোন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে হিজলী গ্রামে স্মার্ট যুব ক্লাব স্থাপন করা হয়েছে, যাতে গ্রামের যুব সমাজ মোবাইল ফোনে আসক্তি কমানো যায়। মাত্র ছয় মাসের প্রচেষ্টায় দেশের প্রত্যন্ত এই হিজলী গ্রাম এখন হয়ে উঠেছে প্রথম সারির স্মার্ট ভিলেজ ।

স্থানীয় কৃষি অফিস বলছে,  হিজলী গ্রামকে স্মার্ট ভিলেজ করতে গ্রামের প্রায় ৪৫০টি উঠানের অনাবাদী জমির অর্ধেক অংশে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়েছে, অবশিষ্ট  সব জমিও আবাদের আওতায় আসবে এবং বিষমুক্ত সবজি চাষাবাদ করা হবে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সরকারের সব দপ্তর একসঙ্গে হিজলী গ্রামকে স্মার্ট ভিলেজের মডেল করার জন্য কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ ধারণাকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনগ্রসর ও পিছিয়ে পড়া হিজলী গ্রামকে স্মার্ট ভিলেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।  গ্রামটি সার্ভে করা হয়েছে, কোথায় কোথায় সমস্যা সব বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে, ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে সবার জন্য সেবা নিশ্চিত করা হবে এবং সরকারি অফিসের সেবা পৌঁছে যাবে গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায়, এর সঙ্গে থাকবে সামাজিক মূল্যবোধ, নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। মাত্র ছয় মাসের প্রচেষ্টায় দেশের প্রত্যন্ত এই হিজলী গ্রাম এখন হয়ে উঠেছে প্রথম সারির স্মার্ট ভিলেজ।

শুধু স্মার্ট ভিলেজ নয়, স্মার্ট সিটি গঠনেরও কাজ চলছে। আমরা জানি, এরই মধ্যে সরকার স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নে ২ হাজার ২১০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে বৈদেশিক ঋণ মিলবে ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার, ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের ৩২টি পৌরসভার সাড়ে ৩২ লাখ মানুষের জীবনমান বদলে যাবে, আর এসব পৌরসভার সক্ষমতা আয়ও বাড়বে।  প্রাথমিকভাবে ৩২টি পৌরসভা এবং দ্বিতীয় ধাপে ৫৩ পৌরসভা ও আটটি সিটি করপোরেশনে এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে, পর্যায়ক্রমে দেশের সব পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনকেই এই প্রকল্পের অধীনে নেওয়া হবে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হলে নাগরিকদের উন্নত জীবনমান নিশ্চিতের পাশাপাশি স্মার্ট পৌরসভার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, আধুনিক ১৭৫টি ট্রাক ক্রয়, বর্জ্য পরিবহনে ২৭০টি ভ্যান ও ৮১০টি ট্রলি যুক্ত হবে, তিন ধরনের গণশৌচাগার নির্মাণ করা হবে, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ছাড়াও কমিউনিটি কেন্দ্রিক শৌচাগারও নির্মাণ করা হবে, কমিউনিটি পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টয়লেট নির্মাণ করা হবে, আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৩০টি পরিশোধনাগার নির্মাণ করা হবে, যার মাধ্যমে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ ও সার। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিকভাবে ৩২ ধরনের প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে, ১০০ কিলোমিটার পাইপ লাইন ও ৩৪৭ কিলোমিটার ড্রেন তৈরি করা হবে, আর পানি সরবরাহের জন্য ৩০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হবে।

এই প্রকল্পটি গ্রহণের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, নগরায়ণের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বাংলাদেশ। নগর-গ্রাম-শহরে বাস করা বিশাল এ জনসংখ্যার নিরাপদ নাগরিকসেবা এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছানো যায়নি। খাবারের পানিতে এখনো দূষণ রয়েছে। কিন্তু এসডিজি বাস্তবায়নে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, এখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ নগরে বাস করে, যার মধ্যে বস্তিবাসী সাড়ে ৩ শতাংশ।  এখানে উল্লেখ্য যে, স্মার্ট সিটির ধারণা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলো তাদের শহরের ব্যবস্থাপনা সাজিয়েছে, সেখানে অবকাঠামো, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশনসহ বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, উন্নত ধ্যান-ধারণা যুক্ত হওয়ায় এটি একটি ব্যাপক কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশেও  এটার প্রয়োগ সম্ভব। সেক্ষেত্রে শহরগুলোর সক্ষমতা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় নিতে বলেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। তবে দক্ষ জনবল বা স্মার্ট পিপল ছাড়া শুধু প্রকল্পের মাধ্যমে সফলতা আসবে না। এছাড়া  সরকারের  স্মার্ট  বাংলদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে, যদি সরকারের ধারাবাহিকতা থাকে।

লেখক : অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা