গতকাল ইত্তেফাকের একটি আন্তর্জাতিক খবর পড়ে বিস্মিত হলাম। একজন বয়োবৃদ্ধ রাজনীতিবিদ এত আত্মশক্তি পান কোথা থেকে? যে বয়সে তার অবসর নেওয়ার কথা, সেখানে রাজনীতির মাঠ এখনো তিনি দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও সাম্প্রতিক কালে তিনি জাতীয় নির্বাচনে নিজ এলাকার আসনে জামানত হারিয়েছেন, কিন্তু তার দুরন্ত সাহস ও ধৈর্য দেখে মনে হচ্ছে তিনি আমৃত্যু রাজনীতিবিদই থাকতে চান। তিনি আর কেউ নন, আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার ড. মাহাথির মোহাম্মদ।
ইত্তেফাকের খবরটির শিরোনাম হলো : মাহাথির মোহাম্মদের ফের দলবদল। এবার অল্প পরিচিত বুমিপুতেরা পারকাসা মালয়েশিয়া বা পুত্রা নামের দলে যোগ দিয়েছেন তিনি। তার বয়স এখন ৯৭ বছর। এই বয়সেও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়—এটা ভাবা যায়? দেখে মনে হচ্ছে, তিনি হাল ছাড়ার পাত্র নন। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি তার প্রতিষ্ঠিত পেজুয়াং তানাহ এয়ার দলের আরো ১৩ জনকে নিয়ে এই দলে যোগদান করেছেন। এই বয়সেও তিনি সফল হওয়ার মিশন ও লক্ষ্য নিয়ে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তিনি হয়তো দলটির উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করতে পারেন। তার গোটা জীবনই আমাদের জন্য শিক্ষণীয়।
আমরা হয়তো অনেকে জানি না, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক ও আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ড. মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশের একজন সুহৃদ ও অকৃত্রিম বন্ধু। তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বোচ্চ শুভাকাঙ্ক্ষী এবং মুক্তিসংগ্রামের বলিষ্ঠ সমর্থক। বাংলাদেশকে তিনি মনেপ্রাণে ভালোবাসেন। এর ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। সেটাই আমি আজ পাঠকদের জানাতে চাই। তিনি ও তার পরিবার বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে আনুমানিক ৩০০ বছর আগে মালয়েশিয়ায় হিজরত করেন। বাংলাদেশের শুচি-স্নিগ্ধ মাটির সোঁদা গন্ধ তার পারিবারিক সূত্রে তার দেহ-মনে মিশে আছে। এজন্য বাংলাদেশকে মাহাথির মোহাম্মদ আসলে শর্তহীনভাবেই ভালোবাসেন এবং বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার সারথি বলে পরিচয় দিতে গর্ব করেন।
গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকের পশ্চাৎপদ মালয়েশিয়ায় ১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে তিনি দেশটিকে পশ্চিমা বিশ্বের সমান্তরাল করে গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তার সৃজনশীল প্রতিভার বিচ্ছুরণে রাতারাতি পিছিয়ে পড়া মালয়েশিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সমান্তরাল আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এতে পশ্চিমা বিশ্ব ও আরব বিশ্বে তাক লেগে যায়। তিনি ১৯৮১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করে রেখেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে বিরল নজির স্থাপন করেন। পুনরায় ২০১৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন।
বাংলাদেশে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮৩, ১৯৯১ ও ১৯৯৯ সালে তিনবার রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের সময়ে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে তার সঙ্গে আমার সিভিক রিসিপশনে দেখা হয়। তার একটি সাক্ষাৎকারের জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি সাক্ষাত্কার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময়ের অভাবে সেবার দিতে পারেননি। কিন্তু ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি যখন আর প্রধানমন্ত্রী নন, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার শিল্প-বণিক সমিতির অনুষ্ঠানে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তার ঢাকায় আসার সংবাদ আগেই জেনে আমি ২০ নভেম্বর ২০০৪ সালে তাঁকে কুয়ালামপুরের ঠিকানায় আমাকে ইন্টারভিউ দেওয়ার একটি প্রস্তাব পাঠাই।
তার ঢাকা আগমনের আগেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসবিষয়ক আমার লেখা ইংরেজিতে ১০০০ পৃষ্ঠা সংবলিত বই ‘Bangladesh Wins Freedom’ লেখকের উপহারস্বরূপ কুয়ালালামপুরে তার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। সেই সূত্রে তার অফিসের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় এবং আমার সঙ্গে ঢাকায় তার সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারিত হয়। সেই মোতাবেক হোটেল সোনারগাঁওয়ে ২০০৪ সালের ২২ ডিসেম্বর তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে আমার বইটি তার হাতে তুলে দিই। সেখানে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শিল্প-বণিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সাহেবও উপস্থিত ছিলেন।
অতঃপর আমি তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। তিনি আমার বইটি হাতে নিয়ে বললেন, ‘তোমার বই পুরোটা আমি পড়ে এসেছি। কিন্তু আক্ষেপ আমার, স্বাধীন বাংলাদেশ যার সৃষ্টি, সেই মহান নেতার সঙ্গে আমার দেখা হলো না! অথচ, তার বয়স আমার বয়স কাছাকাছি ছিল। তার কাছ থেকে আমার মতো লোকদের শিক্ষা নেওয়ার, দীক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু ছিল। বাংলাদেশে যতবার আসি, সেই আফসোস ও মর্মবেদনা নিয়ে ফিরে যেতে হয়। আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবকে অসময়ে হারানো বিশ্ব মানবজাতির জন্য বিরাট পরাজয়।’ বঙ্গবন্ধুর জন্য তার এই অসীম আফসোস ও মর্মবেদনা আজও আমাদের ভাবায়।
মানবজাতির সেই পরাজয়ের বেদনা অশ্রুসিক্ত বক্ষে রক্তক্ষরিত হৃদয়ে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর বীর বাঙালি জাতি তার বীরকন্যা শেখ হাসিনার নির্ভিক নেতৃত্বে হিমালয়ের শক্তিতে পুনঃউত্থিত হচ্ছে। কবি নজরুল ইসলামের কণ্ঠস্বরে বীর বাঙালি জাতির কণ্ঠে ইস্পাত কঠিন শপথ পুনরায় উচ্চারিত হচ্ছে, ‘বল বীর চির উন্নত মম শির’। মালয়েশিয়ার মতো বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য এই সরকারের ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই বলে অনেকে মনে করেন। আমরা মাহাথির মোহাম্মদের লড়াকু জীবনের সুস্থতা কামনা করি। আল্লাহ বাংলাদেশের এই বন্ধুকে আরো দীর্ঘজীবী করুন।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ রচয়িতা ও স্বাধীন বাংলা বেতারের সাবেক ওয়ার করেসপনডেন্ট