“সেদিন ছিল ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। শেষ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে আমাদের মধ্যে প্রচুর আর্টিলারি ফায়ার শুরু হয়। ঐ রাতে ভয়াবহ রকমের এক যুদ্ধে লিপ্ত হই। কোম্পানি কমান্ডার লে. বদিউজ্জামান পাকিস্তানি বাহিনীর গোলার আঘাতে আমার বাংকারের ১৫-২০ হাত দক্ষিণে শহিদ হন। পরদিন ভয়াবহ ঐ যুদ্ধে আরো কয়েক জন শহিদ হন এবং বেশকিছু আহত হন। আহতদের মধ্যে কোম্পানির সিনিয়র জেসিও সুবেদার চাঁন মিয়া একজন। ইতিমধ্যে সকালে উভয় পক্ষের গোলাগুলি বন্ধ হলে বাংকার থেকে উঠে লে. বদিউজ্জামান ও আমির হোসেনের শেলের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও নিথর দেহ দেখতে পাই। একটু দূরে সুবেদার চাঁন মিয়াকে দেখি একটি বাংকারের পাশে পাকিস্তানি বাহিনীর শেলের আঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় ‘পানি পানি’ বলে আর্তনাদ করছেন, এ যেন এক কারবালা প্রান্তর। আমি আমার পানির বোতল খুলে তাকে পানি খাওয়াতে গেলে নায়েক সুবেদার শফিউল্লাহ বলেন, ঐ অবস্থায় চাঁন মিয়াকে পানি খাওয়ালে তিনি মারা যেতে পারেন। এ কথা শুনে আমি তাকে পানি খাওয়ানো থেকে বিরত থাকি। এর পর আহতদের চিকিত্সার জন্য দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। শহিদ লে. বদিউজ্জামানসহ অন্যদের আযমপুরে সমাহিত করা হয়।” ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি মো. হুমায়ূন কবির।
যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। বয়স ১৪-১৫ বছর হবে। হুমায়ূন কবিরের বাড়ি ছিল কুমিল্লার দেবীদ্বার। কুমিল্লা ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহাসড়কের পাশেই। বাড়িতে বসেই তখন দেখছিলেন মহাসড়ক ধরে বহু মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার বাবা আয়েত আলী নৌসেনা হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ফলে গ্রামের অনেকেই তার বাবার কাছে পরামর্শ নিতে আসতেন। তিনি যখন যুদ্ধের যাওয়ার কথা বাবার সঙ্গে আলোচনা করলেন, তিনি রাজি হলেন না। মূলত বয়স কম হওয়ায় বাবা রাজি হচ্ছিলেন না। “একদিন বাবার পকেট থেকে ২০ টাকা চুরি করে আমি, মোসলেম আর মোস্তাক যুদ্ধে অংশ নিতে বাড়ি থেকে রওনা দিই। আমরা তিন বন্ধু আগরতলার উদ্দেশে রওনা দিলাম। সেখানে পৌঁছার পর কংগ্রেস অফিসে রাত্রি যাপন করলাম, খেলাম চিড়াগুড়।”
এই মুক্তিযোদ্ধা বলছিলেন, “সেখান থেকে পরদিন সকালে আমাদের বাসে তুলে দেওয়া হলো এবং ড্রাইভারকে বলে দেওয়া হলো যে, সে যেন আমাদের দুর্গা চৌধুরীপাড়ার বাস স্টেশনে নামিয়ে দেয়। ওখানে নামার পর জানতে পারলাম, কিছুটা উত্তর দিকে জয় বাংলার যুবশিবিরের অবস্থান। হাঁটতে হাঁটতে একসময় আমরা যুবশিবিরে উপস্থিত হলাম। কাছাকাছি অবস্থানে তিনটি যুবশিবির ছিল সেখানে। বাংলাদেশের নদীর নামে যেগুলোর নাম—পদ্মা, মেঘনা ও গোমতী। গোমতীতে আমাদের আশ্রয় মিলল, যার দায়িত্বে ছিলেন বুড়িচং থানা নির্বাচনি এলাকার প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্য অ্যাডভোকেট আমির হোসেন। আমাদের নাম তালিকাভুক্ত করার পর ওখানে এক রকম রেজিমেন্টাল জীবন শুরু হলো। সকালে বাঁশি বাজলে মাঠে সমবেত হওয়া, পিটি, প্যারেড, এভাবেই জুন মাস কেটে গেল। জুলাই মাসও শেষ হলো। আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে শুনলাম, বেঙ্গল রেজিমেন্টে নিয়োগের জন্য বাছাই করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল আমাদের যুবশিবিরে আসছে। দুই দিন পর মেজর নাসিমের নেতৃত্বে লে. নাসির ও একজন ডাক্তার আমাদের ক্যাম্পে এলেন, শুরু হলো বাছাই পর্ব। আমি শারীরিক বাছাই পর্বেই বাদ পড়ে গেলাম। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল। প্রাথমিক বাছাইয়ে যারা টিকেছে তারা কঞ্চির ঘেরা দেওয়া একটি জায়গার ভিতরে জমায়েত হয়েছে এবং যারা বাদ পড়েছে, তাদের দূরে সরে যেতে বলা হলো। আমি বাদ পড়া দল থেকে পৃথক হয়ে কঞ্চির ঘেরা দেওয়া জায়গার আশপাশে ঘোরাফেরা করছি। ইতিমধ্যে প্রাথমিক বাছাই শেষে নির্বাচক দলের সবাই একটু দূরে বসে চা খাচ্ছিলেন। আমি ঐ সুযোগে কঞ্চির বেড়া ডিঙিয়ে প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ দলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। বাছাইকৃত দলটির দু-এক জন হইচই শুরু করেছিল, আমি তাদের বিনয়ের সঙ্গে তা না করতে অনুরোধ করলাম। কারণ হিসেবে তাদেরকে বললাম যে, আমি ঢুকে পড়ায় তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। ওরা আমার অনুনয়ে চুপ করে গেল। একসময় শুরু হলো মেডিক্যাল। আমি মেডিক্যাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের একজন হয়ে গেলাম।
“একদিন সন্ধ্যায় হঠাত্ দেখি সেনাবাহিনীর একটি বড় ট্রাক আমাদের শিবিরে এসে উপস্থিত। সঙ্গে এসেছেন সুবেদার মেজর করিমসহ কিছু এনসিও। ক্যাম্প কমান্ডারের মাধ্যমে আমাদের জানানো হলো, যারা নির্বাচিত হয়েছে তাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে নেওয়ার জন্য তিনি এসেছেন। আমরা যাত্রা শুরু করলাম। বেশ কয়েক ঘণ্টা পথচলার পর এক জায়গায় এসে আমাদের গাড়ি থামল, জিগ্যেস করে জানতে পারলাম, ঐ জায়গার নাম ফটিকছড়া এবং তা নবগঠিত ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তর। সেখানে আমি পেলাম ব্রাভো কোম্পানি। ট্রেনিং ক্যাম্পে আমাদের মতো নির্বাচিত প্রায় ৭০০ জনের সমাবেশ ঘটেছিল। প্রথম দিনের ট্রেনিংয়েই বুঝে যাই যে, প্রকৃতই আমি সেনাবাহিনীর একজন সদস্য। ভোর থেকে শুরু হতো প্রশিক্ষণ। পিটি, ড্রিল, সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র খোলা ও জোড়া দেওয়াসহ সব ধরনের প্রশিক্ষণ হতো। ১৫-২০ দিন প্রশিক্ষণের পর শারীরিকভাবে দুর্বল ও যুদ্ধের অনুপযোগী হিসেবে ১২/১৪ জনকে পৃথক করা হলো, দুর্ভাগ্যবশত আমিও এদের একজন। আমাদেরকে পুনরায় যুবশিবিরে ফেরত যেতে নির্দেশ দেওয়া হলো। আমি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে মেজর নাসিমের সামনে দাঁড়ালাম, স্যালুট দিয়ে বললাম—‘স্যার, আমি অনেক কষ্ট করে ৩য় বারের চেষ্টায় এ পর্যন্ত এসেছি। আমার বয়স কম, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, শরীর হালকা-পাতলা, কিন্তু আমার মনটি এ দেশের মুক্তিসংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অনেক দূর পাড়ি দিয়ে কুমিল্লার দেবীদ্বার থেকে এ পর্যন্ত এসেছি, আমাকে স্যার যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ দিন। প্রয়োজনে আমার সাহসিকতার পরীক্ষা নিন।’ আমার কথা শুনে তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, তার পর সুবেদার মেজর করিমকে বললেন, ‘ওকে নিয়ে নিন।’ আমি ছাড়া বাদ পড়া বাকি সবাই যুবশিবিরে ফিরে গেলেন।
অবশেষে দুই মাসের প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের ৩৫০ জনকে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে পাঠানো হলো। আমার জায়গা হলো ব্রাভো কোম্পানিতে। যার কমান্ডার ছিলেন লে. বদিউজ্জামান। ২৯ নভেম্বর আখাউড়াকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৭ ব্রিগেডের অবস্থানের ওপর আমাদের আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু হয়। ২য় ইষ্ট বেঙ্গল ফটিকছড়া অবস্থান থেকে তাঁবু গুটিয়ে যুদ্ধাভিযানে কিছু পথ হেঁটে, কিছু পথ সামরিক যানবাহনে চড়ে আগরতলা বিমানবন্দরের কাছে উপস্থিত হই। লে. বদিউজ্জামানের নেতৃত্বে সীমান্ত অতিক্রম করে রাতে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে একটি বড় গোরস্থানের পাশে আমরা অবস্থান গ্রহণ করি। গোরস্থানে পৌঁছামাত্রই আমাদেরকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনীর আর্টিলারি শেল আসা শুরু হয়। এ ধরনের আক্রমণের জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা সবাই গোরস্থানের মাটি বসে যাওয়া পুরোনো বিভিন্ন কবরে অবস্থান নিই। আমি ওরকম একটি কবরে অবস্থান নেওয়ার পর ওর মধ্যে একটি কঙ্কাল দেখতে পাই। প্রথমে কিছুটা ভীত হলেও জীবন রক্ষার জন্য বিষয়টিকে সহজভাবে গ্রহণ করতে বাধ্য হই এবং রাইফেলের মাথায় লাগানো বেয়নেট দিয়ে কঙ্কালটিকে এক পাশে সরিয়ে রেখে আমার এক সহযোদ্ধাসহ ওখানে অবস্থান নিই। শুরু হলো যুদ্ধ। এক পর্যায়ে বোমা বর্ষণ বন্ধ হওয়ার পর কোম্পানি কমান্ডারের নির্দেশে আখাউড়া-সিলেট রেলপথে আযমপুর রেল স্টেশনের পূর্ব দিকে আমরা অস্থায়ী বাংকার তৈরি করি। হাবিলদার হাকিম ও আমি একই বাংকারে অবস্থান গ্রহণ করি। হাবিলদার হাকিম এলএমজি ও আমি ব্যাকআপ হিসেবে এসএলআর নিয়ে অবস্থান নিই। আমাদের অবস্থানের ওপর দিনরাত কিছুটা থেমে থেমে পাকিস্তানি বাহিনীর আর্টিলারির গোলা আসতে থাকে। ৪ ডিসেম্বর বিকালে আমাদের গুলি প্রায় ফুরিয়ে আসে এবং উভয় পক্ষের যুদ্ধও কিছুটা ঢিমেতালে চলে। আমাদের কমান্ডার আমাকে ও আমার মতো নবীন সহযোদ্ধা আরিফকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছুটা দূরে গুলি সংগ্রহ করে আনার জন্য নির্দেশ দেন। পরে আমরা গুলি নিয়ে আবার বাংকারে ফিরে যাই। এর পর আবার যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করি।
“১৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ হয়ে ১৬ ডিসেম্বর সকালে ঢাকা স্টেডিয়ামে এসে পৌঁঁছাই। সেখানে অনেকেই আমাদের দেখতে এসেছিলেন।”
জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু যখন গণভবনে (বর্তমানে সুগন্ধা) সব এমপিদের নিয়ে বৈঠক করেন, সেদিনও সিপাহি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর পাশেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর আর্মির সিপাহির চাকরি ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যান। দেশ স্বাধীনের পর পর তিনি বাড়িতে না ফেরায় তার মৃত্যু হয়েছে এটা নিশ্চিত মনে করে পরিবারের সদস্যরা মিলাদও পড়িয়েছেন। বাড়িতে ফেরার পর এপ্রিলেই এসএসসি পরীক্ষা দেন। পরে তিতুমীর কলেজ থেকে বিএসসি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি করে কিছুদিন ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতাও করেন। ১৯৮৮ সালে বিসিএস দিয়ে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন। ২০১৬ সালে বরিশালের ডিআইজি হিসেবে অবসর নেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।