সীতাকুণ্ডে অক্সিজেন কারখানায় বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে ব্যস্ত ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত টিম। নিহত ছয় জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অসতর্কতার কারণে বারবার সীতাকুণ্ডের কারখানাগুলোতে দুর্ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভারী এসব কারখানায় শ্রমিক-কর্মচারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। দুর্ঘটনাস্থলে গতকাল রবিবারও উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে নতুন করে কোনো কিছু পাওয়া যায়নি। পরে জেলা প্রশাসন গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাকিব হাসান উদ্ধার কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এদিকে নিহতদের মরদেহ চমেক হাসপাতালের মর্গ থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ডে গত শনিবার সীমা অক্সিজেন লিমিটেড নামের একটি কারখানায় বিস্ফোরণে ছয় জন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতরা চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কারখানাটিতে অক্সিজেন তৈরি করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হতো। বিস্ফোরণ এত ভয়াবহ ছিল, কারখানার ভেতরে স্থাপনা, গাড়ি ও অক্সিজেন সিলিন্ডার সবকিছু পুড়ে গেছে। দগ্ধ হয়ে নিহতদের চেনা যাচ্ছে না।
বিস্ফোরণে নিহতরা হলেন—মো.শামসুল আলম (৫৬), মো. ফরিদ (৩৬), রতন লখরেট (৪৫), আবদুল কাদের (৫০), সালাউদ্দিন ও সেলিম রিচিল। আহতরা হলেন—মো. ফোরকান (৩৩), নুর হোসেন (৩০), আবদুল মোতালেব (৫২), মো. আরাফাত (২২), মাকসুদুল আলম (৬০), মো. ওসমান (৩৫), মো. সোলায়মান (৪০), মো. রিপন (৪০), মো. আজাদ (২২), রিপন (৬০), নারায়ণ ধর (৬৪), মো. জসিম (৫০), ফেন্সী (২৬), মো. জাহেদ (৩০), মুজিবুল হক (৪৫), রোজি বেগম (২০), মাহিন শাহরিয়ার (২৬), নওশাদ সেলিম (৬০), মো. মনসুর, প্রভাষ (৪০) ও মো. শাহেদ। এদের মধ্যে প্রভাষকে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
চমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. রাজিব পালিত বলেন, চিকিৎসাধীন সবাইকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। একজন আইসিইউতে আছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
এদিকে বিস্ফোরণের পরই কারখানার মালিকপক্ষ সবাই আত্মগোপনে চলে যান। হতাহতে পাশে না দাঁড়িয়ে তারা পালিয়ে গেছেন। ঘটনার পর প্রশাসন তাদের খোঁজ করেও কারো সন্ধান পায়নি। স্থানীয় লোকজন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে গতকাল দুপুরে কারখানার একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেন। কারখানাটি মোহাম্মদ শফি নামে এক ব্যক্তির। তিনি মারা গেছেন। বর্তমানে তার তিন ছেলে কারখানাটি পরিচালনা করছেন।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক আবদুল হালিম বলেন, উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এখন বিস্ফোরণ কেন হল তা অনুসন্ধান করছি। বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। কিন্তু বিস্ফোরণটা কী কারণে হয়েছে তার তদন্ত চলছে। তদন্তের পর কারণ বলা যাবে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জেলা প্রশাসনের তদন্ত টিমের সঙ্গে কাজ করছেন।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কারখানা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করবে। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার অভিযান শেষ হলে মামলা করা হবে। কর্তৃপক্ষের কী ধরনের অবহেলা আছে, কারা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তা খুঁজে বের করা হচ্ছে। কারখানায় দুর্ঘটনার সময় ২৫ জন শ্রমিকসহ ৪২ জন কাজ করছিলেন।
গতকাল শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ও নিহতদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি টিম আহতদের দেখতে আসে। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান। বিস্ফোরণে আহতদের চিকিৎসা চমেক হাসপাতালে চলছে। আহতদের আঘাতের অবস্থা অনুসারে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে জেলা প্রশাসন কন্ট্রোল রুম খুলেছে। এতে হতাহতের নামের তালিকা, তথ্য সংগ্রহ, চিকিত্সাসহায়তা দেওয়া হচ্ছে। হতাহতদের স্বজনেরা এসে নাম-ঠিকানা জমা দিচ্ছেন।
চমেক হাসপাতালের নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন আহত নওশাদ সেলিম চৌধুরী। তিনি মাথায় কাচ ও লোহার টুকরায় আঘাত পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘প্ল্যান্টের কাছে অফিসে বসে কাজ করছিলাম। কিছুক্ষণ আগে পরিচালক আনোয়ার সাহেব বের হয়ে যান। তখন হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণ। চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। চারদিকে চিত্কার-চেঁচামেচি। কীভাবে আমি বের হয়েছি কিছুই জানি না।’ প্ল্যান্টের উৎপাদন সেকশনের কাজ করেন আহত মোতালেব। তিনি বলেন, ‘কোমর ও মাথায় বেশি আঘাত পেয়েছি। মাথায় ছয়টি সেলাই হয়েছে। আমি তখন ভেতরে কাজ করছিলাম। আমরা ১০ জন ছিলাম। আমি কোনোভাবে বের হয়ে এসেছি।’