‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারিত হচ্ছিল মঞ্চে, স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। হাজার হাজার তরুণ মিলেছিল জয় বাংলা কনসার্টে। তারুণ্যের মধ্যে ৭ই মার্চের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে দিতে আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত কনসার্ট মুখরিত হয়ে উঠেছিল তরুণদের উচ্ছ্বাসে। মহান মুক্তিযুদ্ধে এই স্লোগান যেমন সারা দেশের মানুষকে এক সূত্রে গেঁথেছিল, তেমনি প্রতিটি সংকটে এবং জাতির অর্জনেও যেন এই স্লোগান পুরো জাতিকে একতাবদ্ধ করে, আজও। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণ উপলক্ষে ‘জয় বাংলা’ কনসার্টের আয়োজন করে সেক্রেটারিয়েট সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)-এর তারুণ্যের প্ল্যাটফরম ‘ইয়াং বাংলা’।
২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে এ কনসার্ট আয়োজন করে আসছে। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরআই) ইয়াং বাংলা এমন একটি প্ল্যাটফরম, যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে—বাংলাদেশের সর্বস্তরের যুবকদের সমন্বিত করে তাদের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা।
করোনাকালের দুই বছর বন্ধ থাকার পর গতকাল আর্মি স্টেডিয়ামে আবার বসেছিল জয় বাংলা কনসার্ট। ফুলবাড়িয়া ও গুলিস্তান বিস্ফোরণে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।
কাতার থেকে দেশে ফিরে সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটে কনসার্টে এসে উপস্থিত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী এ সময় স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার তরুণের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। গানে গানে ঠোঁট মেলাতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও সিআরআইয়ের ট্রাস্টি নসরুল হামিদ বিপু। শেখ রেহানার ছেলে ও সিআরআই ট্রাস্টি রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক শুরু থেকেই কনসার্টে উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধুর সেই উত্তাল ভাষণ, যা সারা বাংলার মুক্তিকামী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। জুগিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা। সেই বিশেষ দিনে দেশের তরুণদের ৭ই মার্চের ভাষণে উজ্জীবিত করতে গতকাল বুধবার এই কনসার্টের আয়োজন করা হয়। শিল্পীরা কনসার্টে নিজেদের গানের পাশাপাশি গেয়ে শোনান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অমর গানগুলো—যা তারা উৎসর্গ করেছিলেন দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যারা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে জীবনবাজি রেখেছিলেন।
দেশের প্রতিটি দুর্দিনে ৭ই মার্চের চেতনায় গর্জে ওঠার দুরন্ত আহ্বান নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে হাজির হয়েছিল দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড দলগুলো। কনসার্টে অংশ নেয় দেশের ৯টি ব্যান্ড দল। এর মধ্যে ছিল ব্যান্ড দল—অ্যাভয়েড রাফা, ক্রিপটিক ফেইট, আর্টসেল, চিরকুট, নেমেসিস, লালন, আরেকটা রক ব্যান্ড, মেঘদল, কার্নিভাল।
প্রতিটি ব্যান্ড দলই স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত অনুপ্রেরণামূলক গানগুলো গেয়ে শোনায় দর্শকদের। বড় পর্দায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেখানো হয়, দেখানো হয় বিশেষ ভিডিওচিত্র। এছাড়াও গানের ফাঁকে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ছোট ছোট অংশ ভিডিও উপস্থাপনার মাধ্যমে দেখানো হয়। ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অবলম্বন করে গানের মিউজিক ভিডিও পরিবেশনা। এদিকে সন্ধ্যার পর শিল্পীদের কোরিওগ্রাফিতে পরিবেশিত হয় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অবলম্বনে বিশেষ নৃত্য আয়োজন।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হতেই পুরো আর্মি স্টেডিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। গানের সুরে নেচে গেয়ে বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত আনন্দে মেতে ওঠেন তরুণদের দল। কনসার্টটি উপভোগ করার জন্য প্রায় ২০ হাজার সংগীতানুরাগী ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিবন্ধন করে। এছাড়া বেশ কয়েকটি চ্যানেলে সরাসরি কনসার্টটি দেখানো হয়।
প্রতিটি ব্যান্ড দলই মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণাদায়ী গান দিয়ে শুরু করেন তাদের পরিবেশনা। তবে দেশাত্মবোধক গানের পাশাপাশি প্রতিটি দলই তাদের জনপ্রিয় গানগুলো কনসার্টে গেয়ে শোনায়। ‘আরেকটি রকব্যান্ড’ কনসার্টে ড্রাম বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো দর্শক গানের উন্মাদনায় মেতে ওঠেন। ‘আমার দেশ সব মানুষের’ স্বাধীন বাংলা বেতারের এ গান দিয়ে শুরু করেন তারা। এরপর ‘কার্নিভাল’ শুরু করে স্বাধীন বাংলা বেতারের ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ গান দিয়ে। এরপর মঞ্চে আসে ‘মেঘদল’। তারা শুরুতেই পরিবেশন করে ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’, ‘ক্রিপটিক ফেইট’ গেয়ে শোনায় ‘মা গো ভাবনা কেন’। ‘নেমেসিস’ গেয়ে শোনায় ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’, অ্যাভয়েড রাফা শুরুতেই গেয়ে শোনায় ‘একসাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘আর্টসেল’ পরিবেশন করে ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘লালন’ ব্যান্ড দলও শুরু করে দেশের গান দিয়ে। তারা গেয়ে শোনায় ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল’।