হিমি ফিরে আসবে

দার্জিলিং শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে পাহাড়ের পাদদেশে ইভান কাঠুরিয়ার বসবাস। স্ত্রী মারিয়াকে নিয়ে তাদের সাজানো গোছানো ছোট্ট সংসার। দুজনের মধ্যে বেশ বোঝাপড়া। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক। তাই গাঁয়ের সবাই তাদের অত্যন্ত পছন্দ করে। তবুও তাদের মনে শান্তি নেই। থাকবে কী করে? তারা যে নিঃসন্তান!

শীতের দুপুর। পাহাড়ি ঝরনাধারা জমে বরফ হয়ে গেছে। জমে যাওয়া বরফকুচি নিয়ে একদল শিশু-কিশোর খেলায় মত্ত। ওরা একবার বরফকুচি দিয়ে মূর্তি গড়ছে আবার ভাঙছে। বাড়ির আঙিনায় ইভান আর মারিয়া লাকড়ির মাচা সাজাচ্ছিল। ইভান একটু এগিয়ে গিয়ে ছেলেদের বলল, ‘এই তোমরা এটা কী করছ?’ এরপর ছেলেগুলো আরো একটা মূর্তি বানাল, যেটা কিনা মায়াবী ছোট্ট এক মেয়ে। সেটাকে তারা না ভেঙে অন্য মূর্তি গড়ায় মন দিল। মেয়েটার দিকে তাকিয়েই ইভানের মনে এক অলৌকিক অনুভূতি জেগে উঠল। মনের অজান্তেই ছোট্ট মেয়েটাকে সে বলে ফেলল, ‘তুমি আমার সঙ্গে কথা বলো।’ হঠাত্ একইভাবে মারিয়াও বলল, ‘হিমি, তুমি জীবন্ত হয়ে যাও, আর সবার সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠো। তুমি সত্যি সত্যিই প্রাণবন্ত মেয়ে হয়ে ওঠো।’

মেয়েটি অবাক করে দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে গেল, আর বলতে লাগল, ‘আমি শীত-বরফ আর তুষারের দেশ থেকে এসেছি।’

হিমি দৌড়ে গিয়ে ইভান আর মারিয়াকে জড়িয়ে ধরল। তারপর সেদিন রাতে গ্রামে জমজমাট নাচগানের উত্সব হলো। পরদিন সকাল থেকেই হিমি পুরোটা শীতকাল গ্রামের শিশু-কিশোদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে রইল। গাঁয়ের সবাই তাকে ভালোবেসে ফেলল।

ইভান, মারিয়া আর হিমির দিন বেশ সুখেই কাটছিল। ধীরে ধীরে শীত ফুরাবার সময় চলে এল। হালকা দখিনা বাতাস বসন্তের আগমনী বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। শীতের শেষ রাতে হিমি ইভান আর মারিয়ার শোয়ার ঘরে প্রবেশ করল। সে তার জলভরা চোখে তাদের বলতে লাগল, ‘বাবা, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। মা, বসন্ত শুরুর আগেই আমাকে উত্তরের শীত-বরফ আর তুষারাচ্ছন্ন এলাকায় ফিরে যেতে হচ্ছে।’

ইভান বলল, ‘তুমি থেকে যাও, মা।’

‘তা কী করে হয়? আমি দুঃখিত, বাবা। এটা সম্ভব নয়।’

‘না, তোমাকে যেতে দেবো না’ বলেই মারিয়া হিমিকে জাপটে ধরল। একদৌড়ে ইভান দরজার ছিটকিনি এঁটে দিল।

এরপর তারা হিমিকে জড়িয়ে থাকা অবস্থায় শূন্যতা অনুভব করল। তারা বুঝতে পারল যে হিমি গলে গেছে। তাদের শরীরের মতোই মনটাও ভীষণ রকম দুঃখে ভিজে গেল! তারা পুরোটা বসন্ত আর গ্রীষ্ম ভীষণ নিরানন্দে কাটাল!

গরম ফুরিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে উত্তরী বাতাস শীতের আগমনীবার্তা দিয়ে যাচ্ছে। সবে চারদিকে তুষারপাত শুরু হয়েছে—তেমনি এক শীতের রাতে ইভান আর মারিয়া শুনতে পেল, ‘বাবা, দরজা খুলে দাও। মা, আমি তোমাদের হিমি। শীত আবার আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।’

ইভান দরজা খুলে দিতেই হিমি তাদের দুজনকেই জড়িয়ে ধরল। তাদের সংসারে যেন আনন্দের ঢল নেমে এল।

হিমি পুরোটা শীত গাঁয়ের শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে রইল।

গ্রামে আবার দখিনা হাওয়া বয়ে যেতে লাগল। দু দিন পরেই বসন্তের আগমনী ধ্বনিত হবে। এবার হিমির বিদায়ের পালা। তাই সে ইভান ও মারিয়ার কাছে বিদায় চাইল। এবার আর তারা হিমিকে আটকাতে চাইল না। বরং চোখের পানি আড়াল করে হাসিমুখে বিদায় দিল। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে—শীত এলেই হিমি আবার ফিরে আসবে।

 

রাশিয়ার রূপকথা ‘লিটল স্নোগার্ল’-এর ছায়া অবলম্বনে