মাদারীপুরে সড়কে নিহত ২০

‘আফসানা তুই ফিরে আয়, আমি কাকে নিয়ে থাকব’

‘আফসানা তুই ফিরে আয়। আমি কাকে নিয়ে থাকবো।’ এভাবেই মায়ের সঙ্গে আহাজারি করতে করতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আফসানা মিমির (২৪) ছোট বোন রুকাইয়া ইসলাম রূপা। রোববার (১৯ মার্চ) সকালে মাদারীপুরের শিবচর এক্সপ্রেসওয়েতে মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।  

Takerhat 19-03-23 (Road Accident Human Story) Pic.1

নিহত আফসানা মিমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগ থেকে এমএস করেছেন। এর আগে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেছেন।  

জানা যায়, সকালে মা কানিজ ফাতেমা ও ছোট বোন রুকাইয়া ইসলাম রূপা গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু কলেজের সামনে থেকে আফসানা মিমিকে ইমাদ পরিবহনের বাসে উঠিয়ে দেন। ওই বাসে ঢাকা পৌঁছে সেখান থেকে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ আনতে যাওয়ার কথা ছিল আফসানা মিমির। কিন্তু সে যাওয়া মাঝ পথেই থেমে গেলো।

Madaripur Shibchar Road Accident-8

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিহত আফসানার মা কানিজ ফাতেমার আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে আশেপাশের পরিবেশ। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কোনোভাবেই শান্ত করা যাচ্ছে না।

পুলিশ জানায়, রোববার (১৯ মার্চ) সকালে খুলনা থেকে যাত্রী নিয়ে ইমাদ পরিবহনের একটি বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। পদ্মাসেতুর আগে ঢাকা-খুলনা এক্সপ্রেসওয়ের মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় বাসটির সামনের একটি চাকা ফেটে যায় এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় অন্তত ২৯ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পাঁচ্চর রয়েল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ জন ও শিবচরের বিভিন্ন হাসপাতালে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

Takerhat Shibchar (Road Accident) Pic 5

এদিকে নিহত ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনের পরিচয় জানা গেছে। বাকি তিন জনের পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। নিহতরা হলেন, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার হিতডাঙ্গা গ্রামের সৈয়দ মুরাদ আলীর ছেলে মো. ইসমাইল (৩৮), গোপালগঞ্জের গপিনাথপুর গ্রামের হেদায়েত মিয়া বাহার (৪২), নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কালনা গ্রামের বকু সিকদারের ছেলে ফরহাদ সিকদার (৩০), গোপালগঞ্জের পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক অনাদী রঞ্জন মণ্ডল (৪২), গোপালগঞ্জ সদরের বনগাঁও এলাকার সামছুল শেখের ছেলে মোস্তাক শেখ (৩০), গোপালগঞ্জ সদরের ছুটকা গ্রামের নশর আলী শেখের ছেলে সজিব শেখ (২৬), গোপালগঞ্জ সরদরের পাঁচুরিয়া গ্রামের মাসুদ মিয়ার মেয়ে সুইটি আক্তার (২২), গোপালগঞ্জর টুঙ্গিপাড়ার নিলফা গ্রামের কাঞ্চন শেখের ছেলে কবির শেখ, গোপালগঞ্জ সদরের আবু হেনা মস্তফার মেয়ে আফসানা মিমি (২০), গোপালগঞ্জ মুকসুদপুরের আদমপুরের আমজাদ আলী খানের ছেলে মাসুদ খান (৩২), খুলনার সোনাডাঙার শেখ আহমেদ আলী খানের ছেলে শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন (৪২), খুলনার চিত্তরঞ্জন মণ্ডলের ছেলে চিন্ময় প্রসন্ন মন্ডল, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার পরিমল সাধুর ছেলে মহাদেব কুমার সাধু, খুলনার টুটপাড়ার শাজাহান মোল্লার ছেলে আশরাফুল আলম লিংকন, সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সখীপুর গ্রামের আমজেদ আলী সরদারের ছেলে রাশেদ সরদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার অনন্তপুর গ্রামের আলী আকবরের ছেলে জাহিদ ও গোপালগঞ্জ সদরের পুরান মানিকদি গ্রামের ইমাদ বাসের সুপারভাইজার মিনহাজ বিশ্বাস (২২)। 

Madaripur Shibchar Road Accident-9

নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করে স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে লাশ দাফনের জন্য ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আর আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ জানতে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’

Madaripur Shibchar Road Accident-10

মাদারীপুর রিজিওনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হাইওয়ের ডিআইজি সালমা বেগম বলেন, এ দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হয়েছেন। এতে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনায় অন্তত ২৯ জনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পাঁচ্চর রয়েল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।