মুক্তিযুদ্ধের মৌখিক ইতিহাস

১৯৭১ সাল। বাংলাদেশ নামক একটি ফুলকে বাঁচাতে অস্ত্র ধরেছিল হাজারো বাঙালি। প্রত্যেকের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল মুক্তির জয়গান। দেশ মাতৃকার প্রতি ভালোবাসায় উজ্জীবিত হয়ে  ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ রক্ষায়। টানা নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারার আমাদের লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছেন। আর এই স্বাধীনতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে গ্রথিত হয়ে গেছে নাম না জানা কতশত ভাইয়ের রক্তমাখা জামা, বোনের লুপ্ত গৌরব, কত মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, সন্তান হারানোর বেদনা আর প্রিয়জন বিয়োগের শোক।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৮টি বছর আমরা পার করেছি। যুদ্ধজয়ী টগবগে যুবকেরা এখন জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ। সময়ের পরিক্রমায় এখন জীবনের পড়ন্ত বিকেলে উপনীত হয়েছেন তাঁরা। অনেকে বিগত হয়েছেন। তাঁদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁদের অমূল্য স্মৃতিকথা। অনেক বীরযোদ্ধা বয়সের ভারে ন্যুব্জ, অসুস্থ; অনেকের স্মৃতিশক্তিও লোপ পেয়েছে।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে অনেক লেখকের গ্রন্থই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু সরাসরি মুক্তিযোদ্ধাদের মুখ নিঃসৃত শ্রুতিকথা খুব কম গ্রন্থেই প্রতিফলিত হয়েছে। তাই স্থানীয় পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, বাঙালির ওপর পাকিস্তানিদের পৈশাচিক নির্যাতনের কথা বর্তমান ও আগামীর প্রজন্মকে জানানোর জন্য উদ্যোগ নেন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার সাবেক নির্বাহী অফিসার মনিরুজ্জামান। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কিছু করার আগ্রহ তাঁর দীর্ঘদিনের। সে আগ্রহ থেকেই তিনি তাঁর বন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে আলাপ ও পরিকল্পনা করেন এবং উদ্যোগ নেন। তাঁদের আহ্বানে যোগ দেন ফোকলোর বিভাগের প্রফেসর মোস্তফা তারিকুল আহসান ও ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন। কাজটি বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ফোকলোর বিভাগের ত্রিশজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা বেরিয়ে পড়েন। পৌঁছে যান গাবতলী উপজেলার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধাদের যাপিত জীবন কেমন ছিল, তাঁরা কিভাবে যুদ্ধ করেছেন, কেনই বা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, এসব প্রশ্ন নিয়ে তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি হন। টানা ৭ দিন তাঁরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ২১২ জন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথা সংগ্রহ করেন। এরপর সেগুলো লিপিবদ্ধ করে ‘মুক্তিযুদ্ধের শ্রুতিকথা গাবতলীর সূর্যসন্তানেরা’ নামে বই আকারে প্রকাশ করেন। 

সাক্ষাত্কার গ্রহণকারী সোহরাব নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘যখন সাক্ষাত্কার নিচ্ছিলাম তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সীমাহীন নিপীড়নের কথা শুনে মুক্তিযুদ্ধকে খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি।’

গত ২২ এপ্রিল গাবতলী উপজেলা পরিষদে বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সাক্ষাত্কারদাতা মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় কষ্টার্জিত সেই সাফল্য সংগ্রামের কথা।

বইটি পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকেন এই সূর্যসন্তানেরা। নিজের গল্পটি দেখতে পেয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন অনেকেই। এ সময় মিলনায়তনে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

মুক্তিযোদ্ধা খাজা নাজিম উদ্দীন জানান, ‘দেশপ্রেমে ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মকথাকে অমর করে রাখার প্রয়াসে উপজেলা প্রশাসন ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যে কাজটি করেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।’

সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। এই মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস তথা বীর বাঙালির গণযুদ্ধের শ্রুতি কাহিনি সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সম্পাদনা কাজের মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও উপজেলা প্রশাসন তথা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি চমত্কার যৌথ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এমনি করে বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের যৌথ প্রচেষ্টা ইতিহাস-ঐতিহ্য চর্চা ও জনকল্যাণমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।’