তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। কেননা এই সকল দেশে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের চাইতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ও প্রভাব কোনো অংশে কম নহে। তাহারা যাহাদের পক্ষে থাকেন, নির্বাচনে তাহাদের জয় লাভের সম্ভাবনা থাকে তত বেশি। এই সকল দেশের নির্বাচনে অবৈধ বা কালো টাকার ব্যবহারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যাহারা ৫-১০ বৎসর বা তাহারও অধিক ক্ষমতায় থাকেন, তাহারা থাকেন সুবিধাজনক অবস্থায়। বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে তাহারা এত অগাধ সম্পদের মালিক হন যে, এলাকাবাসী বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন তোলেন, তাহারা এত টাকা পাইলেন কোথায়? তাহারা কি আলাদিনের চেরাগ হাতে পাইয়াছেন? ইহার আগে তাহাদের কেহ কেহ নিত্যন্ত গরিব ও ফকির ছিলেন। উন্নয়নশীল এই সকল দেশে দুর্নীতির অভিযোগ নূতন নহে। অনেক সময় প্রশাসনের সহিত যোগসাজশ করিয়া তাহারা রাতারাতি আঙুল ফুলিয়া কলাগাছ হইয়া উঠেন। দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক সময় তাহাদের টিকিটি বা কেশাগ্রও স্পর্শ করিতে পারে না। কেননা খোদ এই কমিশনও দশচক্রে ভগবান ভূতের মতো তাহারাও শেষ পর্যন্ত আর ধোয়া তুলসীপাতা থাকিতে পারেন না। এই সকল কারণে এই সকল দেশে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে যখন মামলা-মোকদ্দমা হইতে দেখা যায়, তখন অনেকে ইহাকে আইওয়াশ ও রসিকতা ছাড়া আর কিছু মনে করেন না। এই জন্য এই সকল দেশে নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হইয়া উঠে অর্থ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের উর্বর ক্ষেত্র। ইহাতে নির্বাচন কমিশনের চাহিয়া চাহিয়া দেখা ছাড়া আর তেমন কিছু করিবার থাকে না। নির্বাচনের মাঠের দখল চলিয়া যায় স্থানীয় মাস্তান বা তাহাদের সমর্থক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্যদের হাতে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া এই জন্য এই সকল দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও সহিংসতা দেখা দেওয়াটা একটি সাধারণ বিষয়। ইহার রেশ নির্বাচনোত্তর সময়েও বিরাজমান থাকে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশেও নির্বাচনকে সম্মুখে রাখিয়া পিটাপিটি ও মারামারির দৃশ্য আমরা কম দেখি না। টেলিভিশন ও সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তাহা ঘরে বসিয়াই লাইভ দেখা যায়। নির্বাচনে অবৈধ অর্থের ব্যবহার বাড়িয়া গেলে সেই নির্বাচন কীভাবে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ হইবে? বলা হইয়া থাকে, প্রার্থীরা নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি খরচ করিতে পারিবেন না। কিন্তু যাহারা এই সকল দেশের নির্বাচনি মাঠের ন্যূনতম খোঁজখবর রাখেন, তাহারা জানেন এই সকল দেশে জাতীয় নির্বাচন তো দূরে থাক, স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও খরচের হিসাব কোটির ঘর ছাড়াইয়া যায়। বরং নির্বাচন কমিশন যখন বলে অতিরিক্ত খরচ করা যাইবে না, তখন সেই সকল দেশের প্রাজ্ঞ ভোটাররা মুখ টিপিয়া হাসেন। এই সকল দেশের বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন, সংসদ চোর-ডাকাত আর ব্যবসায়ীদের দ্বারা ভরিয়া গিয়াছে, তখনো তাহারা না হাসিয়া পারেন না। যেইখানে একটি সংসদীয় আসনে লড়িতে হইলে আজকাল ১৫/২০ কোটিরও বেশি টাকা প্রয়োজন, সেইখানে ইহা লইয়া প্রশ্ন তোলা কি অবান্তর নহে? এই জন্য এই সকল দেশে যখন যে ক্ষমতায় থাকেন, সবাই সেই দলেই আসিয়া ভিড় জমাইতে চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হরিলুটের ব্যবস্থা ও ব্যাপক বৈষম্য থাকিলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আয়োজন করা কঠিন বইকি। এই জন্য এই সকল দেশে রাস্তার কাজ না করিয়া ফেলিয়া রাখা হয়, কাজ না করিয়াই বিল উঠাইয়া নেওয়া হয়, এলাকার সকল কাজ একাই লইয়া যাওয়ার ঘটনা ঘটে, পিডিকে ঘুষ দিয়া হাতে রাখা হয়, রাজধানীতে বসিয়াই কাজ ভাগাভাগি করা হয় ইত্যাদি।
সম্পদ আহরণ বা অর্জন করা অন্যায় বা দোষের কিছু নহে। তবে সেই সম্পদ অর্জন অবশ্যই প্রশ্নমুক্ত হইতে হইবে। অথচ এই সকল দেশে বিভিন্ন এজেন্সি রহিয়াছে, পুলিশের তদন্ত টিম রহিয়াছে। কেহ যদি অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করেন, তাহা হইলে সেই এলাকার ভিক্ষুকরা পর্যন্ত জানিলেও তাহারা জানিতে পারেন না কেন? যত উপরে যাওয়া যায়, ততই দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্গন্ধময় মানুষের হাত আবুধাবির বুর্জ খলিফার মতো ততই লম্বা হইতে দেখা যায়। এমন সমাজ ও দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা করাটাই কি হাস্যকর নহে?