ভ্যাট অটোমেশন ও বাস্তবতা

জুলাই ১৯৯১ এ বাংলাদেশে প্রথম ভ্যাট আইন চালু হয়। সে হিসেবে মূসক আইনের বয়স ৩১/৩২ বছর। প্রথম পাস হওয়া আইনে মূসক প্রদানের বহু হার থাকায় মূসক আইনের মূল থিমের পরিপন্থী হয়। এরপর সরকার বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগিতায় মূসক আইন ২০১২ নামে নতুন আঙ্গিকে মূসক আইন তৈরি করার কাজ শুরু করেন। সেটার মূল থিম ছিল মূসকের এক হারে সকল স্তরে বিভিন্ন ভাবে প্রদান করা মূসক সমন্বয়ের পর নিট মূসক প্রদান করতে হবে। মূসক হল ভোক্তা কর, ব্যবসায়ের প্রতি স্তর বা প্রতি হাত বদলে মূল্য সংযোজিত হয়, আর সেখানেই যুক্ত হয় মূসক। এই করের ব্যবস্থাপনাও হবে প্রতিটা স্তর বিবেচনায়।

প্রতিটা স্তরের সংযোজিত মূল্যের ভ্যাট যদি অগ্রিম না হয়ে পণ্য মূল্যের সাথে যোগ হয় তাহলে বৃদ্ধি পায় পণ্য মূল্য যা কোন স্তরের ব্যাবসায়ী প্রদান করেন না। এই পদ্ধতির সমস্ত অসঙ্গতির দায় গিয়ে পরে অসহায় ভোক্তার উপর। ভোক্তা হল সাধারণ মানুষ যাদের কোন সংগঠন নেই। তাই অধিকার আদায়ে স্লোগানও নেই। মেনে নিতে হয় আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে। তবে বিভিন্ন সময়ে ব্যাবসায়ীদের কথা বিবেচনা না করে, শুধুমাত্র অধিক ভ্যাট আদায়ের স্বার্থে মূসক আইনে পরিবর্তন আনা ও বিভিন্ন হার থাকায় সেটা এক হারে এনে, রেয়াত সমন্বয়ের ব্যবস্থা রেখে ২০১২ সালে নতুন মূসক আইন করার কমিটি করা হয়।

মূসক আইন ২০১২ প্রণয়ন করার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভ্যাট অটোমেশন করে সকল প্রকার মূসক ফাঁকি প্রতিরোধ করা। অবশ্য পুরাতন আইনেও অটোমেশন করতে পি সি আর মেশিন স্থাপন করা হয়। যা পরিকল্পিত ভাবে না হওয়ায় সরকারের কোটি কোটি টাকার প্রজেক্ট বিলীন হয় কালের গর্ভে। সেই প্রবাদের মত ‘‘সরকার কো মাল, দরিয়া মে ডাল’’। এমনকি কারো কোন জবাবদিহিতাও নেই। আবার জানতে চাওয়া হল না কি সমস্যায় সফলতা পেল না। যদি সেটা জানা যেত তাহলে নতুন আইনে অটোমেশন করতে সেগুলো কাজে লাগতো। যাইহোক যত বেশি প্রজেক্ট, তত বেশি আয়, যদিও এই সকল অর্থই আসে রাজস্ব থেকে।

পূর্বের আইনের মত বহু মূসক হার ও আরো অনেক জটিলতা নিয়ে ২০১২ সালের আইন কার্যকর হল জুলাই ২০১৯ এ। যদিও অটোমেশন করার সমন্বয়হীনতার কারণে ব্যাবসায়ীদের প্রথমে নয় ডিজিটের বিআইএন দিয়ে, পরে সেটা আবার তের ডিজিট করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কেত্তন ভেবে ব্যবসায়ীরা সেটা করা ছাড়া উপায় পান না। বিদেশি বিনিয়োগ আনতে যে পরিমাণ ঘি মাখাতে হয় তার অর্ধেক ঘি যদি দেশীয় উদ্যোক্তাদের দেওয়া হতো তাহলে ব্যবসায়ীরা কোন ভাবেই বিদেশে অর্থ নেওয়ার কথা ভাবতেন না। নতুন আইন পাস হলে, চালু হওয়ার কথা ছিল অটোমেটিক ভ্যাট আদায় পদ্ধতি। কিন্তু এখনও সেটা অধরাই রয়ে গেল।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতায় বলেছিলেন, ‘‘বাবা বলেছিল, দেখিস, আমরাও একদিন…, বাবা এখন অন্ধ, দেখা হয় নাই কিছুই’’। বর্তমানে অটোমেশনের নামে আবার আমদানি হল ইএফডি মেশিন। যা কতোটুকু ফলদায়ক বা যে বিপুল টাকা এই প্রজেক্ট এ ব্যয় হবে, সেই টাকা এই মেশিন দ্বারা আদায় করতে পারবেন তো? সেটা যাচাই করা ছাড়া সবাই এক সুরে গান শুরু করলেন- ‘সব জায়গায় ইএফডি মেশিন দিতে পারলে সমাধান হবে ন্যায্য ভ্যাট আদায়ের ও ব্যবসায়ীর ভ্যাট জটিলতা দূর করার’।

কথা ও প্রচারণায় মনে হল, এই মেশিন লাগানোর পর সকল ব্যবসায়ী উৎসাহ নিয়ে ঈদের আনন্দে ভ্যাট প্রদান করবেন। বাস্তবতা হল এই মেশিন ব্যাবহারের কোন উৎসাহ কারো নেই। যারা করছেন সেটাও ভ্যাট কর্মকর্তাদের ভয়ে। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি এটাও পূর্বের  মতো ইতিহাস হতে খুব বেশি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

অন্য দশটা আইনে সেটা না মানায় অপরাধ করলে ফাঁসি দেওয়া গেলেও, মূসক আইন ব্যবসায়ীরা এর লাভজনক হার, যার জন্য যতোটুকু দরকার ও ব্যবসায়ের ধরন অনুসারে গাইড লাইন তৈরি এবং সেটার উপর তাদের দক্ষ করতে না পারলে যতোভাবে অটোমেশন করা হোক না কেন সেটা কালের পরিক্রমায় ইতিহাস হতে বাধ্য।

আমাদের সাধারণ জ্ঞান সেটাই মনে করে। আর কত দিন টেস্ট এন্ড এরোর ভিত্তিতে সরকারের টাকা, যা আসে সকল স্তরের মানুষের কস্টার্জিত আয় বা বিশ্ব ঋণ থেকে। যা দিয়ে অনেক অনাহারী মানুষকে দেওয়া যাবে খাদ্য বা শিক্ষা বঞ্চিত কয়েক লাখ শিশু দেওয়া যাবে শিক্ষা। এটা এখন সময়ের দাবি এভাবে কোন কিছু চলতে পারে না বা চলতে দেওয়া যায় না। যারা দায়িত্ব নেবে যে অংশের ভ্যাট অটোমেশন করার তারা সেটার সফলতা না পাওয়া গেলে কোন অর্থ ছাড় করা হবে না এবং সেটার প্রত্যয়ন করতে হবে সেই সেক্টরের ব্যবসায়ীরা দ্বারা। তাহলেই পাওয়া যাবে ভ্যাট অটোমেশনের সফলতা ও তৈরি হবে কর্মকর্তাদের দায়বদ্ধতা।

লেখক:  ভ্যাট বিশেষজ্ঞ