জাল সনদ দিয়ে কর্মী প্রেরণ

অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না

জাল সনদ দিয়ে সিঙ্গাপুরে কর্মী প্রেরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও চারটি রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। জানা গেছে, প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে প্রবাসী কল্যাণ ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো নিশ্চুপ। চারটি রিক্রুটিং এজেন্সি হচ্ছে, দি গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল, আল জান্নাত ওভারসীজ প্রা. লি., আর এক্স কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল এবং ওয়েলটেক এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস। দৈনিক ইত্তেফাকে ঐ চারটি এজেন্সির অনিয়মের বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটি এজেন্সিগুলোর প্রতারণার প্রমাণও পায়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থ না নেওয়ায় সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, দি গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল সিঙ্গাপুরস্থ বিল্ডিং কন্সট্রাকশন অথরিটি (বিসিএ)-এর জাল অনুমোদনের সনদ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণায়ে জমা দিয়ে এখনো সিঙ্গাপুরে কর্মী প্রেরণের নামে প্রতারণা করে আসছে। অথচ ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরস্থ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অথরিটি নানা প্রতারণার কারণে দি গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল ও তার সিঙ্গাপুরস্থ পার্টনার ওয়েল্টেক কনস্ট্রাকশন প্রাইভেট লিমিটেডের বাংলাদেশে দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষণ ও স্কিল্ড সার্টিফাইড টেস্ট লাইসেন্স বাতিল করে। কিন্তু গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছর সিঙ্গাপুরের বিসিএর জাল সনদ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়ে কর্মী প্রেরণের স্কিল্ড সার্টিফাইড লাইসেন্স বছর বছর নবায়ন করে। সিঙ্গাপুর সরকারের অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে ধোঁকা দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কর্মীর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো থেকে আরো তিনটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণ করে সিঙ্গাপুরে কর্মী প্রেরণ করে। গণমাধ্যমে এই প্রতারণের সংবাদ প্রকাশের পর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এ বিষয়ে তদন্ত করে প্রতারণার সত্যতা পায়। বিএমইটির গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বিসিএ-এর ওয়েবসাইট যাচাই করে দেখা গেছে, ওভারসিজ টেস্ট সেন্টার হিসেবে কর্মীদের ট্রেনিংয়ের জন্য অনুমোদনের তালিকায় ওয়েলটেক কন্সট্রাকশন তথা গাজীপুর ইন্টারন্যাশনালের নাম নেই। এছাড়া বিগত পাঁচ বছর দি গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল সিঙ্গাপুরে গমনেচ্ছু কর্মীদের প্রশিক্ষণের নিমিত্তে সিঙ্গাপুরস্থ বিসিএর কোনো অনুমোদন ছিল না।

অথচ গত পাঁচ বছর গাজীপুর ইন্টারন্যাশনালসহ এই চারটি রিক্রুটিং এজেন্সি একটি কর্মীকেও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে স্কিল্ড সার্টিফাইড টেস্ট নেয়নি। কীভাবে মন্ত্রণালয়ের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতি বছর সিঙ্গাপুরে কর্মী প্রেরণের স্কিল্ড সার্টিফাইড টেস্টের লাইসেন্স নবায়ন করল সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিয়মানুযায়ী সিঙ্গাপুরে কর্মী প্রেরণের এনওসি নবায়নের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি প্রশিক্ষণ প্রদানকারী ট্রেনিং সেন্টার সরেজমিনে পরিদর্শন করে থাকেন। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর সরকারের সিঙ্গাপুরগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণের অনুমতিপত্র ও বিসিএর ওয়েবসাইটে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কি না তা যাচাই করার কথা। তা হলে ২০১৮ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ বছর সিঙ্গাপুর সরকারের অনুমোদন না থাকা ও একটি কর্মীকেও প্রশিক্ষণ প্রদান না করা সত্ত্বেও কীভাবে উক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ট্রেনিং সেন্টারের প্রশিক্ষণ ও স্কিল্ড সার্টিফাইড টেস্টের অনুমতি পেল। তা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও বিএমইটির বর্তমান কর্মকর্তারা নিজেরাই বিস্মিত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের জালজালিয়াতি বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর পরিপন্থি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। উক্ত অপরাধে রিক্রুটিং লাইসেন্স বাতিল ও জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে।