আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন করে বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানালেও দলটি এরইমধ্যে না যাওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে। এরপর আলোচনার জন্য আরও আটটি রাজনৈতিক দলকে গত বৃহস্পতিবার চিঠি দিয়েছে ইসি। এই আটটি দলের মধ্যে বিএনপির মিত্র বা সমমনা দলগুলোও ইসির আমন্ত্রণে সাড়া দিচ্ছে না। বিএনপির মিত্রদের বাইরেও আমন্ত্রণ জানানো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) অন্যরাও ইসির সঙ্গে আলোচনায় বসাকে চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘অর্থহীন’ মনে করছে।
যে আটটি দলকে ইসি আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেগুলো হলো- সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল ইসি। তখন ৩৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ২৭টি দল সংলাপে অংশ নিয়েছিল। ওই সংলাপে অংশ নেয়নি বিএনপিসহ ১২টি দল। যেই আটটি দলকে এবারও ইসি আমন্ত্রণ জানিয়েছে, ওই ১২টি দলের মধ্যে এই আটটি দলও ইসির আনুষ্ঠানিক সংলাপ বর্জন করেছিল।
ইসির আমন্ত্রণ জানানো লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ গতকাল শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘আজ (গতকাল) বিকাল চারটার দিকে ইসির চিঠি পেয়েছি। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের কোনো ক্ষমতা নেই। তাদের ক্ষমতা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে নির্বাচন করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং সরকারি দলের লোকজন। উল্লেখিত সরকারি কর্মকর্তারা বর্তমানে সরকারের আজ্ঞাবহ। কাজেই ইসির সদিচ্ছা থাকলেও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া তাদের পক্ষে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সেজন্য আমরা মনে করি, এই ক্ষমতাহীন ইসির সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা করাটা অর্থহীন।’
আলোচনা ও মতবিনিময়ের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে গত ২৩ মার্চ বিএনপিকে চিঠি দেয় ইসি। আমন্ত্রণপত্র পাওয়ার পর বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি ইসির আলোচনায় না যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৮ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এবিষয়ে আমাদের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। আমরা নির্বাচন কমিশনে কোনো আলোচনায় যাব না। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা অনর্থক। আমরা মনে করি, এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।’
বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আওয়াল বলেছেন, ‘বিএনপিকে আমন্ত্রণ সংলাপের জন্য জানানো হয়নি, আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার জন্য। বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানানো সরকারের কোনো কূটকৌশলের অংশ নয়, সরকারের সংশ্লেষ নেই। কূটকৌশল হলে সেটা ইসির হতে পারে, সরকারের নয়। সরকারের পরামর্শেও চিঠি দেওয়া হয়নি। ইসি কোনো কূটকৌশল থেকে এই চিঠি দেয়নি।’ সিইসি এ-ও বলেছিলেন, ‘আমরা ব্যথিত হই, যখন বলা হয়, সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করি, আজ্ঞা বহন করিনি। আমরা নির্বাচন বিষয় নিয়ে আলাপ করে আমাদের চিন্তার মধ্যে ফুটে উঠেছে-বিএনপির মতো দলকে নির্বাচনে আনতে পারলে ভালো হয়।’
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করছেন- নির্বাচন নিয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করে কোনো লাভ নেই। কারণ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করার ক্ষেত্রে ইসির কোনো ক্ষমতা নেই। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করাকে ‘অর্থহীন’ মনে করছেন বিএনপি নেতৃত্ব।
এদিকে, নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য বাংলাদেশ মুসলিম লীগকে (বিএমএল) লেখা চিঠি ভুলে সিপিবিকে পাঠিয়েছে ইসি। বৃহস্পতিবার সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের পাঠানো চিঠিতে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সকে সম্বোধন করা হলেও ভেতরে লেখা হয় বিএমএলের কথা।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘ইসি থেকে সংশোধিত চিঠি আমরা এখনও পাইনি। চিঠি পাওয়ার পর দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আমরা এটা বলতে পারি, চিঠি পাওয়ার পর আগে আমরা দেখবো- চিঠিতে ইসি আলোচনার জন্য সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু উল্লেখ করে কিনা। কী বিষয়ে তারা আলোচনা করবে- সেটা তো আমাদের জানতে হবে। তাছাড়া, কয়েক বছর আগে আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সংলাপ করেছি। তখন নির্বাচনকালীন সরকারসহ নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য সিপিবির পক্ষ থেকে আমরা কতগুলো প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। এবার চিঠি পাওয়ার পর, কমিশনকে ফিরতি চিঠি দিয়ে সেই প্রস্তাবনাগুলো সম্পর্কে জানতে চাইবো। তারা না জানালে প্রয়োজনে তথ্য অধিকার আইনে নোটিশ করে জানার চেষ্টা করবো। মোটকথা, নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে ইসির সঙ্গে আলোচনা করা অর্থহীন বলেই আমরা মনে করি।’
নতুন করে ইসির চিঠি পাঠানো বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সরাসরি বিএনপির মিত্র দল। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার দাবিতে এই তিনটি দলও যুগপত্ আন্দোলন করছে। এলডিপি প্রধান অলি আহমদ ইসির আমন্ত্রণে না যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। জানা গেছে, বিএনপির পথ ধরে আ.স.ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এবং মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টিও ইসির আমন্ত্রণে সাড়া দিচ্ছে না।
ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) বিএনপির বিলুপ্ত জোট ২০ দল থেকে আগেই বেরিয়ে গেলেও দলটি নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবির পক্ষে। জানা গেছে, বিজেপিরও ইসির আলোচনায় যাওয়ার সম্ভাবনা কম। চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি)-এর দায়িত্বশীল সূত্র ইত্তেফাককে জানায়, দলটিতে ইসির আমন্ত্রণে না যাওয়ার পক্ষে বেশিরভাগ নেতা ইতোমধ্যে মত দিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল ইসির আমন্ত্রণে সাড়া দিচ্ছে না বলেও দল দুটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন গঠনের আগে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির ডাকা সংলাপেও বিএনপির পাশাপাশি সিপিবি, বাসদ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, জেএসডি, এলডিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ অংশ নেয়নি।