বিপজ্জনক হইয়া উঠিতেছে অনুপ্রবেশকারীরা 

বর্তমান সরকারের বিঘোষিত নীতি হইল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস এবং তাহাদের পোষ্য ও দোসরদের প্রতিহত করা। কিন্তু যাহাদের বিরুদ্ধে তাহারা প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিবার কথা বলিতেছে, তাহাদেরই অনেকে ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করিয়া কলকাঠি নাড়িতেছে। তাহারা এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা লইয়া অগ্রসর হইতেছে। তাহারা শুধু আওয়ামী লীগই নহে, অন্যান্য রাজনৈতিক দলেও অনুপ্রবেশ করিয়া গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি দখল করিয়া বসিয়াছে। এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রেই তাহারা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলিয়া গিয়াছে। ঘাপটি মারিয়া থাকা এই সকল তথাকথিত আওয়ামী লীগার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের অপতত্পরতা দেখিলে মনে জাগে শঙ্কা—দেশটাকে কি আরেকটা সংঘাতের দিকে ঠেলিয়া দেওয়ার চেষ্টা চলিতেছে? 

এই স্বাধীনতা তথা রাষ্ট্রবিরোধীরা মুখে বলিতেছেন তাহারা সরকারপন্থি। অথচ তাহারা অন্তরের দিক দিয়া আসলে সরকারবিরোধী। তোষামোদি করাকে তাহারা শিল্পের রূপ দিয়াছে। ইহার মাধ্যমে তাহারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণের পর্যায়েও চলিয়া গিয়াছে। গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিলে এবং তদন্ত করিলে দেখা যাইবে, তাহারা তলে তলে সরকারবিরোধী কাজই করিয়া যাইতেছে। তোষামোদের মাধ্যমে তাহারা সরকারকে বিভ্রান্তিতে ফেলিতেছে। তাহাদের তোষামোদি দেখিলে মনে হয়, তাহারা যেন জন্মগতসূত্রেই এই সরকারের লোক। অথচ তাহা সত্য নহে। সরকারের মধ্যে থাকিয়া তাহারা সকল রকম সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করিতেছে। এমনকি বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নাম ভাঙাইয়া হেন কোনো অপরাধ নাই যাহা তাহারা করিতেছে না। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় তাহাদের দৌরাত্ম্য বাড়িয়া গিয়াছে। তাহাদের স্যাবোটাজের কারণে ক্ষুণ্ন হইতেছে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি। ইহাতে প্রকৃত নেতাকর্মীরা অসহায় ও কোণঠাসা হইয়া পড়িতেছেন। এমনও ঘটনা ঘটিতেছে যে, আওয়ামী লীগের নেতৃবর্গ অনুপ্রবেশকারী সম্পর্কে মঞ্চে দাঁড়াইয়া জাতিকে সচেতন করিতেছেন, অথচ তাহার পার্শ্বেই অনুপ্রবেশকারী দাঁড়াইয়া হাততালি দিয়া চলিয়াছে। সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ!

এই সকল শান্তি কমিটি, আলবদর, আলশামস বাহিনীর লোকেরা ও তাহাদের চ্যালাচামুণ্ডারা আজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ ও পেশিশক্তির বলে এতটাই বলীয়ান হইয়া উঠিয়াছে যে, তাহারা প্রশাসনসহ দলের নেতাকর্মীদের পর্যন্ত কিনিয়া ফেলিতেছে। মনে রাখিতে হইবে, বাহির হইতে কিছু করিতে না পারিয়াই তাহারা সরকারি দলে অনুপ্রবেশ করিয়াছে। এখন পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুকূলে নাই বিধায় তাহারা সুযোগের অপেক্ষায় রহিয়াছে। মোক্ষম সময়ে তাহাদের রং বদলাইতে সময় লাগিবে না। তখন তাহারা কোনো অবস্থাতেই স্বাধীনতার শক্তিকে মানিয়া লইবে না। জাতীয় নির্বাচন যতই ঘনাইয়া আসিবে, ততই তাহাদের আসল রূপ, রং ও চেহারা উন্মোচিত হইবে। খুলিয়া পড়িবে তাহাদের মুখোশ। দুর্ভাগ্য হইল, ক্ষমতাসীন দলের কেহ কেহ তাহাদের অর্থ-সম্পদের জেরে তাহাদের পক্ষে কাজ করিতেছেন। ক্ষমতাসীনরা কী চিন্তাভাবনায় তাহাদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করিয়া যাইতেছে, তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। তাহাদের ব্যাপারে হয়তো একদিন সঠিক উপলব্ধি ঘটিবে। কিন্তু ততদিনে দেরি হইয়া যাইবে। তাহারা আরো ভয়ংকর ও মারাত্মক রূপ ধারণ করিবে।

সরকার যদি এখনই তাহাদের প্রতিরোধ করিবার ব্যবস্থা না করে, তাহা হইলে রাষ্ট্র আরেকটি সংঘাতের দিকে যাওয়ার আশঙ্কাকে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। এমনও মনে হইতে পারে যে, ইহাতে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করাটাই প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়িবে! কঠিন হইয়া পড়িবে তাহাদের ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করা! তবে, তবে ইহাও স্মরণে রাখিতে হইবে, স্বাধীনতাবিরোধীরা যতই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করুক, যতভাবেই ষড়যন্ত্রের জাল বুনুক, দেশের ১৭ কোটি মানুষ তাহাদের এই বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্র নিশ্চিতভাবেই প্রতিহত করিবে। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীদের এইভাবে ষড়যন্ত্র ও বিশৃঙ্খলা করিবার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের মানুষ ক্ষতির হইবে। এই ক্ষতিটাই দুঃখজনক হইবে, কারণ স্বাধীনতার পক্ষশক্তি সর্বাগ্রে সচেতন থাকিলে অবশ্যই ইহা প্রতিহত করা যাইত। সময় হয়তো ইতিমধ্যে পার হইয়া গিয়াছে, তাহার পরও যতটুকু সময় রহিয়াছে, তাহা কাজে লাগাইতে হইবে।