দুই বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর প্রায়ই পত্রিকায় পাতায় ছাপা হচ্ছে। এ নিয়ে আলোচনা হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বাস চালকদের এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থামাবে কে? কোনোভাবেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ গতকাল রবিবার ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় এমনই দুই বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে প্রাণ গেছে এক জন মোটরসাইকেল চালকের। ক্ষুব্ধ জনতা বাস দুটি পুড়িয়ে দিয়েছে। এর আগেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় দুই বাসের প্রতিযোগিতায় মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের জিরাবো এলাকায় দুটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে মেহেদী হাসান (৩২) নামের একজন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহত মেহেদী হাসান রাজধানী ঢাকার ডেমরা থানার ঠুলঠুলিয়া এলাকার মো. মাজেদ ওরফে বাহারুলের ছেলে। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ জনতা আলী নুর পরিবহন নামের ঐ দুটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। যদিও তার আগে বাস দুটি পুড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা জানান, সকালে আলী নুর পরিবহনের দুই বাস টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়ক হয়ে আব্দুল্লাহপুরের দিকে যাচ্ছিল। জিরাবো এলাকায় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে বাস দুটির আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতার সময় মাঝখানে চাপা পড়ে মোটরসাইকেল আরোহী মেহেদী হাসান নিহত হন। জিরাবো ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা বাস দুটির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। আগুনের ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। নিহত মোটরসাইকেল আরোহীর মরদেহ থানাপুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
গত বছরের জানুয়ারিতে রাজধানীর মগবাজার মোড়ে যাত্রীবাহী তিনটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি বাসের চাপায় রাকিবুল (১৪) নামে এক কিশোর নিহত হয়। সে বাসে হকারি করত। তখন প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, মগবাজার মোড়ে গাজীপুরগামী আজমেরী পরিবহনের তিনটি বাস প্রতিযোগিতা করে চালাচ্ছিল। তখন সামনের দুটি বাসের মধ্যে চাপা পড়ে ঐ কিশোর। রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায় লোকজন। পরে সেখান থেকে বাস চালকরা পালিয়ে যায়।
২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রামপুরায় রাইদা পরিবহনের দুটি বাসের বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় প্রাণ হারান একটি বাসের চালকের সহকারী (হেলপার) নাজমুল হোসেন। রামপুরা ফ্লাইওভারের গোড়ায় আবুল হোটেলের সামনে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত নাজমুল হোসেনের বয়স ১৭ বছর। তখন রামপুরা থানার উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম বলেছিলেন, রাইদা পরিবহনের দুটি বাস পাল্লা দিতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর পালিয়ে গেছে দুই বাসচালক।
ঐ বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বাসের ধাক্কায় তিন পথচারী নিহত হন। বোরাক পরিবহন ও হোমনা সুপার সার্ভিসের দুই বাসের মধ্যে আগে যাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে বোরাক পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তারা প্রাণ হারান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন—কাঁচপুর রায়েরচেক এলাকার ফজল করিমের ছেলে আবু বকর সিদ্দিক (২০), রংপুরের কোতোয়ালি থানার শ্যামপুর গ্রামের প্রয়াত মুকুলের ছেলে ওহিদুল (৩২) ও চাঁদপুরের উত্তর মতলব থানার উদমদি গ্রামের প্রয়াত নকুল সরকারের ছেলে সজীব সরকার (২৮)।
২০১৮ সালে রাজধানীর কাওরান বাজারে সার্ক ফোয়ারার কাছে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারান রাজীব। বহুল আলোচিত সেই ঘটনার কথা এখনো মনে আছে অনেকের। ঐ ঘটনার চার বছর না যেতেই ২০২১ সালের নভেম্বরে আবার দুই বাসের প্রতিযোগিতায় হাত হারিয়েছেন আরেক জন। তার নাম জামাল উদ্দিন। দুর্ঘটনায় হাত হারানোর ১৩ দিন পর মারা যান রাজীব। তবে জামাল বেঁচে গেলেও পঙ্গু হয়েছেন। বন্ধ হয়েছে তার আয়ের পথ। ৬২ বছর বয়সি জামালের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার রাজেন্দ্রপুরে। সাভার পরিবহনের দুটি বাস সদরঘাট থেকে ছাড়ার পর প্রতিযোগিতা শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে জিরোপয়েন্টে (জিপিও) এসে একটি বাস থামে। তার আরোহী জামাল নামার জন্য যে-ই না দরজার বাইরে হাতল ধরেছেন, অমনি পেছনের বাসটি থেমে থাকা বাসটির বাম পাশ ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এতে মুহূর্তেই জামালের বাম হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পথচারী এক নারী ও এক ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেন। পরে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
২০২১ সালের জুনে দুই বাসের প্রতিযোগিতায় মাথা থেঁতলে যায় মেহেদী নামের একজন শিক্ষার্থীর। মেহেদী বসে ছিলেন একটি বাসের জানালার পাশে, তারা মাথা ছিল বাইরের দিকে। সে সময় আরেক বাস পাশ কাটানোর চেষ্টা করলে তার মাথা থেঁতলে যায়। পুরাতন পদ্মা সিনেমা হলের সামনে তুরাগ ও আকাশ পরিবহনের দুটি মিনিবাসের প্রতিযোগিতায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঢাকার একটি কলেজে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন মেহেদী। শুধু এই ঘটনাগুলো নয়, প্রতিনিয়তই এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। কিন্তু বাস চালকদের থামানো যাচ্ছে না।