পঞ্চাশের দশকের কবি ওমর আলী, যিনি ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম তুলে কাব্য রচনা করে ঝড় তুলেছিলেন, তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘ওমর আলী : স্মৃতি ও কীর্তি’ স্মারকগ্রন্থ। বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রতিথযশা লেখক, গবেষক এবং বিদগ্ধজনের পাশাপাশি এ কালের নবীন লেখকদের লেখার মাধ্যমে বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া কবি ওমর আলীর জীবন ও কবিসত্তার স্বরূপ উদ্ভাসিত হয়েছে। কবির সুহৃদ-স্বজন এবং সমবয়সী সাহিত্যিক বন্ধুদের স্মৃতিচারণ, নিবেদিত পঙক্তিমালা, কবিমানস ও সাহিত্যকীর্তি মূল্যায়ন, ওমর আলীর নির্বাচিত রচনা, সাক্ষাৎকার, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র প্রভৃতি দিয়ে গ্রন্থটির কলেবর সাজানো হয়েছে। আবদুল গাফফার চৌধুরী, আল মাহমুদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ, যতীন সরকার, মাহবুবুল হক, হোসেনউদ্দীন হোসেন, রণেশ মৈত্র, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হেলাল হাফিজ, জুলফিকার মতিন, অসীম সাহা, আবুল আহসান চৌধুরী, আসাদ মান্নান, মাকিদ হায়দার, বিশ্বজিৎ ঘোষ, মোরশেদ শফিউল হাসান, আবুল হাসান চৌধুরী, নাসির আহমেদ, সৌমিত্র শেখর, মহীবুল আজিজ, শহীদ ইকবাল, তুষার দাশ, আহমাদ মাযহার, জাকির তালুকদার, শিহাব শাহরিয়ার, শামীম রেজা, তপন বাগচী, মোহাম্মদ আজম, তুহিন ওয়াদুদ, পিয়াস মজিদসহ অর্ধ শতাধিক কবি-লেখক-গবেষকের লেখায় ওমর আলীর জীবন ও কীর্তিগাথা উঠে এসেছে। কবির সহধর্মিণী সহিদা খাতুনসহ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিতে তার ব্যক্তিজীবনের অনেক অজানা তথ্য প্রকাশ হয়েছে।
ওমর আলীর জন্ম ১৯৩৯ সালে, মৃত্যু ২০১৫ সালে। সাতচল্লিশের দেশভাগের আগেই কবিতা লেখা শুরু করলেও ওমর আলীর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে পঞ্চাশের দশকে। আহসান হাবীব, মুনীর চৌধুরী, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, জহুর হোসেন চৌধুরী, আবদুল গনি হাজারী প্রমুখের সান্নিধ্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় তার কবিসত্তা পরিপুষ্ট হয়। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীনের ‘সওগাত’ এবং বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ওই সময়ই কবিতা প্রকাশিত হয়। শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, ফজল সাহাবুদ্দিন, সৈয়দ শামসুল হকসহ পঞ্চাশের যেসব কবি নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টি করেন ওমর আলী তাঁদের সারিতে অনায়াসে জায়গা করে নেন। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। দৈনিক সংবাদে চাকরিসূত্রে ঢাকায় বাস করলেও পরবর্তীকালে পাবনার শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেন। তিনি নিজগ্রাম পাবনার চর কোমরপুরে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটান এবং সেখানকার নিভৃত কুটিরে অবস্থান করে কাব্যচর্চা করেন। চল্লিশের অধিক গ্রন্থরচনা করেন; সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতি-স্বরূপ লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদক।
এ স্মারকগ্রন্থে ওমর আলীর জীবন ও কবিসত্তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিপুল তথ্য-সম্ভারে পূর্ণ গ্রন্থটিতে আবদুল গাফফার চৌধুরী ওমর আলী সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাঁকে ‘একজন মহৎ কবি’ বলে অভিহিত করেছেন। আল মাহমুদ বলেছেন, ‘প্রকৃত কবি’। আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘ওমর আলীর কবিতার নারীদের মতোই তার নিজের কবিতাও সহজ লাবণ্যে স্নিগ্ধ ও মধুময়।’ মুহম্মদ নূরুল হুদা লিখেছেন, ‘ওমর আলী আল মাহমুদের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান কবি।’
বইটি সম্পাদনা করেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, গবেষক-প্রাবন্ধিক ড. এম আবদুল আলীম। প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। প্রচ্ছদ একেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। নান্দনিক প্রচ্ছদ আর উন্নত প্রকাশনাশৈলীর এ বইটির মূল্য রাখা হয়েছে দুই হাজার টাকা।