গুজবের ভয়াবহতা ও নাগরিক সমাজ

গুজব একটি সামাজিক ব্যাধি, গুজবের বিস্তার ও ব্যাপ্তি সর্বত্র লক্ষ করা যায়। গুজবকারীদের রয়েছে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তবে এ বিষয়টি নির্দ্বিধায় বলা যায়, প্রত্যেক গুজবকারীর পেছনে মদতদাতা হিসেবে রাজনৈতিক ইন্ধন তথা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের যোগসাজশ থাকে। বাস্তবিক অর্থে, গুজবের সংস্কৃতি কখনোই সমাজের জন্য সুখকর নয়, গুজব যে কোনো সমাজের জন্য অভিশাপস্বরূপ। গুজব সৃষ্টিকারী চক্রটি মোক্ষম সময়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তাদের উদ্দেশ্যকে নেটিজনদের কাছে প্রকাশ করার সুযোগ গ্রহণ করে থাকে। এর প্রভাবে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ঘোলাটে রূপ ধারণ করে এবং কিছু কিছু জায়গায় গুজবের রেশ থেকে যায় দীর্ঘদিন। কাজেই গুজবের সংস্কৃতিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা জরুরি। 

মিথ্যা তথ্য বা গুজবের প্রতিরোধসংক্রান্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রয়েছে। অনলাইনে গুজব এখন একটা নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিথ্যা তথ্য ছড়ালে প্রথমে তিন বছরের জেলের বিধান রয়েছে। এরপর আবারও আইন ভঙ্গ করলে পর্যায়ক্রমে শাস্তির বিধানও বাড়বে। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর, বিভ্রান্তিমূলক, অশ্লীল, আক্রমণাত্মক, জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা বা যৌনতা নিয়ে করা যে কোনো অমূলক পোস্টই সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই কেউ গুজব বা এ ধরনের পোস্ট ছড়ালে যে-কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অপরাধীকে জামিন অযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর আদালতের রায়ে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে ভুয়া তথ্য ও গুজব ছড়ানোর অপরাধীদের।

বাংলাদেশে গুজবের নজির রয়েছে, একটি পক্ষ সর্বত্র অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির তাগিদ থেকেই গুজবকে কেন্দ্র করে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। পদ্মা সেতু নির্মাণকালে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের হোতারা বিরোধিতা করে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি উদ্ভট উপায়ে মানুষের মাথা ও রক্ত পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত হবে মর্মে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মাথা ও রক্তের জোগান দিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থেকে ছেলেধরা হচ্ছে বলে গুজব রটে। এই গুজবটি মুহূর্তের মধ্যেই দেশব্যাপী আলোড়ন ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ঐ সময়টায় সারা দেশে ছেলেধরা গুজবে মানুষকে বিশ্বাস করতে দেখা যায়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন। ছেলেধরা গুজবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আহত ও নিহত হওয়াদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন নারী, মানসিক রোগী, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধাসহ নিরীহ মানুষ। তবে ছেলেধরা গুজবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় তসলিমা বেগম রেণু হত্যা। বাড্ডায় নিজের মেয়েকে স্কুলে ভর্তির তথ্য জানতে এসে তসলিমা বেগম রেণু ছেলেধরা গুজবের শিকার হয়ে গণপিটুনিতে নিহত হন। এ ধরনের গুজবের পরিণতি মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক ও মর্মবেদনার। রেণুর নির্মম হত্যার বিষয়টি সর্বত্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদর দপ্তর, র‍্যাবের পক্ষ থেকে ছেলেধরা গুজব বন্ধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ছেলেধরা গুজবের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ছেলেধরা অভিযোগে যত জনকে হত্যা করা হয়, তারা কেউই অপরাধী ছিলেন না। রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে এ গুজব রটানো হয়। কাজেই ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে কতগুলো নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। গুজবের পরিণতি প্রত্যেকটি সেক্টরেই এমন ভয়াবহ এবং এটির সর্বশেষ পরিণতি বরণ করতে হয় দেশের আপামর জনসাধারণকে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করোনার সংকটময় মুহূর্তে লবণের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে গুজব ছড়িয়ে পরে। এক কান দুই কান হয়ে সারা দেশে খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির অবতারণা হয়েছিল। রাজধানীসহ সারা দেশে ক্রেতারা মুদির দোকানে ভিড় জমায় লবণ কিনতে এবং অনেকেই জনপ্রতি ১০-১৫ কেজি করে লবণ কেনেন। যদিও সরকারের সচেষ্ট ভূমিকায় এক দিনের বেশি স্থায়ী হয়নি গুজবটি। এদিকে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। পরে তথ্য মন্ত্রণালয়ের গুজব প্রতিরোধ ও অবহিতকরণ সেল এক বিবরণীতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিখোঁজ শিরোনামের খবরটি গুজব বলে নিশ্চিত করে।

এদিকে সংশোধনী মোটরযান আইন অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১ হাজার গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে বলে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি এবং অন্য পাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ছবি সংবলিত নতুন ১০০ টাকার নোট বাজারে আসছে বলে গুজব ছড়ায়। ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা তিন দিন বিদ্যুৎ থাকবে না বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত গুজবের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

যারা গুজব সৃষ্টিকারী ও গুজবের মূল হোতা তাদেরকে চিহ্নিতকরণের কাজটি অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে এ সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সচেতন নাগরিকদের এককাট্টা হয়ে গুজব সৃষ্টিকারী সেলের হোতাদের চিহ্নিত করে প্রচলিত আইনের আওতায় নিয়ে এসে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। তাহলেই পরবর্তীকালে কোনো কুচক্রী গোষ্ঠী গুজব সৃষ্টির পাঁয়তারা করবে না।

সাধারণত বাংলাদেশে নেটিজেনদের সচেতনতার অভাবকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন কুচক্রী মহল গুজব সৃষ্টি করছে। সরকারের উচিত হবে সমাজের সব পেশা-শ্রেণির মানুষকে একত্রিত করে গুজব প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। না হলে শুধু ২০১৯ সাল নয়, সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভিন্ন ধরনের গুজব রটিয়ে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে বিভিন্ন মহল। কাজেই দেশের জনগণকে প্রকৃত সত্য জেনে ব্যবস্থা গ্রহণের স্বার্থে জনগণকে সচেতন করার বিকল্প নেই। নাগরিক সমাজ এ ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে, বিভিন্ন জোনভিত্তিক কমিটি গঠন করে জনসাধারণকে গুজব ও মিথ্যের ভয়াবহতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা প্রদান করতে হবে। তবে এ কথা সত্য, ?গুজব সৃষ্টিকারীদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক থাকতে পারে, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি। 

স্থানীয় সরকার পর্যায়ে মিথ্যা ও গুজব নিয়ে কাজ করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। জনগণকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করতে হবে, ডিজিটাল যুগে কোনো কিছুই গোপন করার সুযোগ নেই, সত্য উদ্ঘাটিত হবেই, সত্য সব সময়ই সুন্দর। সত্য প্রতিষ্ঠিত হলেই গুজবকারীরা কখনোই আশ্রয় পাবে না। দিগভ্রান্ত হয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হা-হুতাশ করে জীবনের ইতি টানা ছাড়া তাদের আর গত্যন্তর নেই। এক্ষেত্রে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উদ্যোগী হয়ে ব্যাপকভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে গুজবকারীরা কোনোভাবেই বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে জনসাধারণের মন ও মানসে। পাঠ্যপুস্তকে গুজবের ভয়াবহতা নিয়ে অধ্যায় সংযোজন করতে হবে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বরা গুজব প্রতিরোধে প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা পালন করে সমাজ থেকে অনাচার, অবিচার, অন্যায় ও গুজব দূরীকরণে প্রয়াস গ্রহণ করতে পারে। 

লেখক : চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।