নগর স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ মাতৃত্বের কৌশল

পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী সদস্য মা হতে চলেছেন, নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত আনন্দের খবর। কিন্তু ঘটনাটি যদি শহরের কোনো বস্তিতে অথবা শহরতলীর কোনো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীতে ঘটে, তবে তা একই সঙ্গে উদ্বেগের বিষয়। অন্তত স্বল্প আয়ের পরিবারে অপুষ্টিসহ অন্যান্য প্রজনন সম্পর্কিত রোগে ভুক্তভোগী প্রসূতি মায়ের জন্য তো বটেই। উদ্বেগের কারণগুলোর প্রথমটি হলো, সেই প্রসূতির পরিবারে অন্যান্য নারী, বিশেষ করে যারা বয়োজ্যেষ্ঠ, তারা হয়তো তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ পন্থায় বা প্রথাগত পদ্ধতিতে তার গর্ভকালীন পরিচর্যা করতে চাইবেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রসূতির শারীরিক অবস্থা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরীক্ষা করা হবে না। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রসূতির অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে, ততক্ষণ তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন করা হবে না। নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন ঘটনা এখনো সচরাচর ঘটে থাকে, অন্তত পরিসংখ্যানভিত্তিক কিছু তথ্য তা-ই বলে। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এই অঞ্চলে ১ লাখ সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রায় ৬০০, যা কমে বর্তমানে ১৬৫তে ঠেকেছে। অর্থাৎ, দেশে মাতৃমৃত্যু কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসজিডি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার ৭০-এ কমানোর জন্য সরকার নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তার পরও বলতে হয়, বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ উন্নতি করছে, তখন একজন প্রসূতি মায়ের মৃত্যুকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, সুস্থ শিশু ও সুস্থ মা সব পরিবারের কাছেই কাঙ্ক্ষিত। 

পরিসংখ্যান বলছে, মাতৃমৃত্যুর ৩১ শতাংশ হয়ে থাকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে, ২৪ শতাংশ হয় খিঁচুনির কারণে এবং ৩ শতাংশ হয় বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত প্রসবে। ৭৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যু ঘটে প্রসব-পরবর্তী সময়ে (সন্তান জন্মদানের ৪৫ দিনের মধ্যে)। সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্নভাবে আমরা জানতে পারি, অনেক প্রসূতি মা রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড, সংক্রমণ, উচ্চরক্তচাপ, প্রসবকালীন জটিলতাসহ বেশ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এমন সমস্যার সমাধান প্রাথমিক পর্যায়ে করা সম্ভব যদি প্রসূতিকে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়ে যথাযথ পরামর্শ ও সেবা দেওয়া যায়। কিন্তু, বিলম্বে সেবা গ্রহণের সিদ্ধান্ত, হাসপাতালে পৌঁছানো ও সেবা প্রদানে বিলম্বসহ নানাবিধ কারণে মায়ের গর্ভধারণ অনিরাপদ হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞদের একটি কথা মানতেই হবে যে, গর্ভধারণের শুরু থেকে প্রসূতির স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হলে তার প্রসব অনেকাংশে নিরাপদ হয়ে যায়। 
নিরাপদ মাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগুলো হলো, স্থানীয় পর্যায়ে (পাড়ায় বা মহল্লায়) দক্ষ চিকিৎসক এবং মিডওয়াইফারির মাধ্যমে প্রসব-পূর্ব মাতৃসেবা, নিরাপদ প্রসবসেবা এবং প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত প্রতিরোধসেবা এবং নবজাতকের সেবার ব্যবস্থা, বিশেষায়িত হাসপাতালে সুপারিশের বা রেফারেল সুবিধার বিস্তৃতি এবং যোগাযোগ বা রোগী পরিবহনব্যবস্থা উন্নতকরণ। উপর্যুক্ত চাহিদার প্রায় সবকিছুর ব্যবস্থাই আছে রংধনু-চিহ্নিত নগর মাতৃসদন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় আরবান প্রাইমারি হেল্থ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট (ইউপিএইচসিএসডিপি)-এর দ্বিতীয় পর্যায় চলমান আছে। প্রকল্পটির আওতায় ১১টি সিটি করপোরেশন এবং ১৩টি পৌরসভা এলাকায় ৩৮টি মাতৃসদন, ১৫০টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৩০০টি স্যাটেলাইট ক্লিনিকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শহরবাসী, বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, মা ও শিশুদের স্বল্পমূল্যে উন্নত প্রাথমিক চিকিৎসা এবং রোগ প্রতিরোধী সেবা দেওয়া হচ্ছে। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা এবং দিনের ২৪ ঘণ্টায় জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সুবিধা পাওয়া যাবে। অতিদরিদ্রদের জন্য আছে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা। আশার কথা, নিরাপদ মাতৃসেবার পরিধি বিস্তৃত করতে মাতৃসদনের সংখ্যা ৩৮টি থেকে ৪৫টিতে উন্নীতকরণে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই সম্পন্ন হয়েছে। 

সন্তান প্রসবের আগে একজন মাকে কমপক্ষে চার বার দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চেকআপ করানো উচিত। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ৬৪ শতাংশ প্রসূতি মা সন্তান প্রসবের আগে মাত্র একবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। চিকিৎসায় বিলম্বের কারণে অনেকে অকাল গর্ভপাত এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবে বাধ্য হন। এ পরিস্থিতি পালটাতে হবে গর্ভকালীন মাতৃত্বকে নিরাপদ করার স্বার্থেই। আর তাই প্রকল্পভুক্ত এলাকায় বসবাসকারী সদ্য বা সম্ভাব্য প্রসূতি মায়েদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আপনারা অন্ধবিশ্বাসে লোকায়ত পন্থা অবলম্বন না করে নিকটস্থ রংধনু চিহ্নিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্পর্কে জানুন এবং প্রাপ্য সেবা আদায় করুন। মনে রাখবেন, গর্ভবতী মা জটিলতামুক্ত ও সুস্থ-সবল থাকলেই সুন্দরভাবে সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারেন।    

লেখক :সহকারী প্রকল্প পরিচালক, আরবান প্রাইমারি হেলথ্ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়