স্থাপনা নির্মাণে সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

‘ব্যবস্থাপনা’ হইল স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনযাপনের মূলমন্ত্র। ইহা শৃঙ্খলাবদ্ধ হইবার শিক্ষা, ভোগান্তি প্রশমনের চাবিকাঠি। উন্নত জাতিগোষ্ঠীর জীবনাচরণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনার অনুশীলন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। পক্ষান্তরে, অনুন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির স্তরে স্তরে অব্যবস্থাপনার বেড়াজাল। যুগের পর যুগ অতিবাহিত হইবার পরও এই সকল দেশের মৌলিখ বিষয়াদির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেই হিমশিম খাইতে দেখা যায়। যেমন—উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশ হিসাবে নানা ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনাকে সঙ্গে লইয়া বাস করিতেছি আমরা। বিশেষ করিয়া, পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের অপরিমাণদর্শিতাই অধিক লক্ষণীয়। লক্ষ করিলে দেখা যাইবে, স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে আমরা বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রাখিতে পারিতেছি না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। জুতসই ও সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনার অভাবে যত্রতত্র অবকাঠামো, স্থাপনা-ইমারত এমনকি বাজারঘাট নির্মাণের কয়েক বৎসর যাইতে না যাইতেই উহা হইয়া উঠে ‘গলার কাঁটা’। উন্নত দেশে স্থাপনা নির্মাণের সময় ভবিষ্যৎ সুবিধা-অসুবিধার কথা বিবেচনায় রাখা হয় সর্বাগ্রে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা যত্রতত্র দেওয়াল তুলি ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করিয়াই। এমনও দেখা যায়, রাস্তার উপরেই বসতি কিংবা মার্কেট গড়িয়া উঠিয়াছে রাতারাতি! সড়ক-মহাসড়ক, পার্ক, খেলার মাঠ এমনকি পর্যটন অবকাঠামোর ঘা ঘেঁষিয়াই গড়িয়া তোলা হয় পাকা দালান! এমনটি কেন হইবে? মানুষের প্রয়োজনের তাগিদেই যেহেতু দালানকোঠা, হাটবাজার গড়িয়া তুলিবার দরকার পড়ে, সেই ক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে তাহা যেন জনভোগান্তির কারণ হইয়া না উঠে, তাহা মাথায় না রাখা কি অপরিণামদর্শিতা নহে? রাস্তাঘাট, সড়কের উপরে বা পার্শ্বে স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সর্বদা মনে রাখা জরুরি, ভবিষ্যতে উক্ত সড়ক বা রাস্তার আকার-আয়তন বাড়াইবার প্রয়োজন হইলে তাহাতে যেন ঐ স্থাপনা ‘বাধার প্রাচীর’ হইয়া না দাঁড়ায়। অর্থাৎ, স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। এবং তাহা হইতে হইবে একেবারে উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় হইতে।

উল্লেখ করিবার বিষয়, সরকারি খাসজমি দখল করিয়া সেইখানে রাতারাতি অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়িয়া তুলিবার কারণে প্রায়ই বড় মাশুল গুনিতে হয় আমাদের। ভূমি অব্যবস্থাপনার সুযোগ লইয়া একশ্রেণির অসাধু লোক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যেইভাবে অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়িয়া তুলিয়াছে ও তুলিতেছে, তাহা বিশেষভাবে বিবেচ্য। বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাসজমি কবজায় লইয়া যেইভাবে ঘরবাড়ি, দোকানপসারির পসরা সাজাইয়া বসা হইয়াছে, তাহা বড় চিন্তার কারণ! ভূমি অফিসের অসাধু কর্মচারীকে ম্যানেজ করিয়া নিয়মবহির্ভূতভাবে খাসজমি দখল বা ইজারা লইয়া অতি মুনাফার উদ্দেশ্যে সেইখানে ‘অপরিকল্পিত স্থাপনা’ গড়িয়া তোলা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইহা জনভোগান্তি ও বিপত্তির উদ্রেক ঘটায়। নগর-মহানগরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খাসজমিতে অবৈধ বিল্ডিং বা বস্তি গড়িয়া তুলিবার কী পরিণাম, তাহা সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল। এই ক্ষেত্রে আমরা বলিতে চাই, সরকারি খাসজমির দেনদরবার করিবার বিষয়ে নিয়ম মানিতে হইবে। সঠিক ব্যক্তির নিকটে উহা ইজারা দিতে হইবে পরিকল্পিত উপায়ে ও শর্তসাপেক্ষে। এবং বর্তমানে যেই সকল খাসজমিতে অবৈধভাবে স্থাপনা গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহা উদ্ধারপূর্বক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনিতে হইবে।

আমরা দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় স্থাপনা, অবকাঠামো নির্মাণের পক্ষপাতী। কিন্তু তাহা হইতে হইবে পরিকল্পনামাফিক। শুধু রাজধানী কিংবা বড় শহরাঞ্চল নহে, স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘কোড’ মানিতে হইবে জেলা-উপজেলা ও ইউনিয়ন অবধি। পরিকল্পিত শহর, নগর গড়িয়া তুলিবার যেই অভিলাষের কথা শুনিতে পাওয়া যায়, জেলা-উপজেলাকে ঢালিয়া সাজাইবার যেই রূপরেখার কথা বলা হয়, তাহাকে বাস্তবে রূপ দিতে হইলে উপজেলা পর্যায়ে স্থাপনা নির্মাণ ব্যবস্থাপনাকে সমভাবে গুরুত্ব দিয়া দেখিতে হইবে। আমরা নূতন নূতন ‘রূপরেখা’ ও  স্থাপনা-অবকাঠামো চাই, কিন্তু তাহা গড়িয়া উঠিতে হইবে সঠিক পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপনার উপর।