সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম অনুষঙ্গ খাদ্য। শরীরের সুস্থতার জন্য সুষম খাদ্য প্রয়োজন। সুস্থ-সবল ও নীরোগ জাতি গঠনের লক্ষ্যে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য অতীব জরুরি। যে জাতি বেশি উন্নত; তাদের খাদ্য, শিক্ষা, চিকিত্সাব্যবস্থাও তত উন্নত। আমাদের দেশের খাদ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ রাস্তায় বিক্রি হয়, যা স্ট্রিট ফুড নামে দেশে-বিদেশে অধিক পরিচিত। এই স্ট্রিট ফুড অনেকটা দেশের খাদ্যাভ্যাসের সংস্কৃতিকে পরিচয় করিয়ে দেয়, তা আবার পর্যটনের সঙ্গেও জড়িত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্ট্রিট ফুড তুমুল জনপ্রিয়। যেমন :পৃথিবীতে বিখ্যাত স্ট্রিট ফুডের শহর হচ্ছে জাপানের টোকিও, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক, ভিয়েতনামের হোচিমিন সিটি, ভারতের কলকাতা ও মুম্বাই। এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর, যিনি ভারতে যাবেন আর স্ট্রিট ফুডের স্বাদ নেবেন না! এর কারণ হচ্ছে, স্ট্রিট ফুডের পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও মানসম্পন্ন খাদ্য। আমাদের দেশের স্ট্রিট ফুডের পরিচ্ছন্নতা ও মান নিয়ে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তা সত্যিই ভয়ংকর!
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে অনেক কিছু, পরিবর্তন ঘটেছে আমাদের খাদ্যাভ্যাসেও। এখন বার্গার, চিকেন ফ্রাই, নুডলস, পাকোড়া, ফ্রেঞ্চফ্রাইসহ আরো অনেক খাবার আমাদের খাদ্যাভ্যাসের অংশ। এসব খাবারের বড় জোগান পাওয়া যায় রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ দোকানে। আমাদের রাস্তার খাবারের মধ্যে রয়েছে ঝালমুড়ি, চটপটি, ফুসকা, হালিম, পানিপুরি, কচুরি, ভাতসহ আরো অনেক প্রকারের খাবার। রাস্তার খাবারের অন্যতম উপযোগিতা হচ্ছে কম দামে মুখরোচক খাবারের সহজলভ্যতা। হ্যাঁ, তুলনামূলক কম দামে, খুব সহজেই এসব মুখরোচক খাবার পাওয়া যাচ্ছে। ফলে দিনে দিনে এর চাহিদার ব্যাপকতা শহরে, বন্দরে, গ্রামেগঞ্জে সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
আমাদের দেশের বেশির ভাগ স্ট্রিট ফুডই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রস্তুত ও পরিবেশিত হচ্ছে। অনিরাপদ পানি, পচা তেল, অপরিষ্কার প্লেট, নোংরা গামছা অর্থাৎ খাদ্য তৈরি থেকে পরিবেশন—কোথাও পরিচ্ছন্ন-স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ের বালাই নেই। এখানে যেন নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি উপেক্ষিত। এক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় আধা কোটির ওপরে মানুষ স্ট্রিটফুড খাচ্ছে। তাহলে পুরো দেশের সংখ্যাটা যে বিশাল হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মূলত মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের মানুষ সরাসরি এসব রাস্তার খাবারের ওপর নির্ভর করে আছে। সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ঢাকার শতকরা ৯০ ভাগ খাবারই অনিরাপদ। খাবারের মান নিয়ে কাজ করে এমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা যায়, ‘রাস্তার খাবারের নমুনার প্রতি গ্রামে ১ হাজার ১০০টির বেশি কলিফর্ম ও ই-কোলাই রয়েছে। অথচ প্রতি গ্রামে সংখ্যাটা ২০-এর বেশি হলে তা বিপজ্জনক। অথচ আমরা অবলীলায় এসব খাবার খেয়ে যাচ্ছি। বদৌলতে আক্রান্ত হচ্ছি বিভিন্ন রোগে। মেডিক্যাল সায়েন্সের আর্টিকেল-সমৃদ্ধ ‘পাবমেভের’ নিবন্ধ মোতাবেক, ‘প্রতি বছর বাংলাদেশে ৩০ লাখের অধিক মানুষ খাদ্যজনিত সমস্যায় ভোগে।’ এসব পরিসংখ্যান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের খাদ্য নিয়ে সচেতনতা অতীব জরুরি।
এবারের খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘নিরাপদ খাদ্য, সমৃদ্ধ জাতি, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার চাবিকাঠি’। নিঃসন্দেহে তা চমৎকার! কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে মাঠ পর্যায়ে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের তেমন জোরদার পদক্ষেপ নেই। বিশেষ করে স্ট্রিট ফুডের বেলায় তা নেহাতই কম। বহির্বিশ্বে শুধু সুনাম বা পর্যটনের জন্য নয়, লাখ লাখ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এসব নোংরা, জীবাণুযুক্ত খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের পরিবর্তে জীবাণুমুক্ত, স্বাস্থ্যকর খাবার সরবরাহে উত্সাহ প্রদান করা, প্রয়োজনে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে। চলছে আত্মশুদ্ধির মাস রমজান। এই সময়ে স্ট্রিট ফুডের আধিপত্য আরো বেড়ে যায়, যা সুস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ ও সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়