দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ছিলাম বাঙালি জাতি। ৭৫ পরবর্তী সময়ের পর হয়ে গেলাম বাংলাদেশি। সেটা নিয়ে, আলোচনা ও সমালোচনা পক্ষে ও বিপক্ষে মত রয়েছে। গঠনমূলক বা যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যায় জানা গেল, বাংলাদেশি হলো নাগরিকত্ব আর বাঙালি হলো সত্তা। কোন ব্যক্তি কানাডার নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট গ্রহণ করেন তিনি বাংলাদেশি থেকে বনে যাবেন কানাডিয়ান। পাসপোর্ট ও দেশ পরিবর্তন করা গেলেও বাঙালি সত্তা বদলানো যায় না। বলতে পারেন এটার সাথে ভ্যাট প্রদানের বিষয় আসছে কেন?
দেশে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করতে ১৯৯১ সালে প্রথম ভ্যাট আইন পাস ও সে অনুসারে আদায় করা শুরু হয়। পৃথিবীর প্রায় ১৭০টি দেশে ভ্যাট ব্যাবস্থা প্রচলন ও আদায় করা হচ্ছে, যতদূর জেনেছি বা শুনেছি এ দেশের ন্যায় এত জটিলতা আর কোথাও হচ্ছে না। কারণ সে সব দেশে ভাষা ও দেশ তত্ত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য সুশীল সমাজ খুঁজে পাওয়া যায় না। ভ্যাট আইন নাগরিকত্ব পরিবর্তন করে বিভিন্ন দেশে গেলেও বাঙালি সত্তার ন্যায় গুণ পরিবর্তন যোগ্য নয়। ভ্যাট আইন সামান্য পরিবর্তন করে বিভিন্ন দেশে আইনের রূপ দেওয়া হয়। সেটাতে সকলে সফলতা পেলেও, আমরা সেই নাগরিক তত্ত্বে আলোচনার মধ্যেই রয়ে গেছি।
সকল দেশে ভ্যাট প্রদান ও আইন এক ধরনের হওয়ার পর আমরা কেন এখনও চোর পুলিশ খেলায় ব্যস্ত। বর্তমানে এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এর সাথে সম্পর্ক যুক্ত সকলকে। দেশে ন্যায্য ভ্যাট আদায় করার জটিলতা সমুহ খুঁজতে যেতে হবে দেশের প্রতিটা জেলায়, বসতে হবে সমজাতীয় সকল ব্যবসায়ীর সঙ্গে। আলোচনায় বের করে আনতে হবে ভ্যাট প্রদানে সুবিধা ও অসুবিধা এবং ভ্যাট প্রদানের চাহিদার বিষয় সমূহ। এরপর সেগুলো বিশ্লেষণ করে কীভাবে আইনের মধ্যে নিয়ে তৈরি করতে হবে তাদের প্রত্যেকে শ্রেণির ব্যাবসায়ীর জন্য আলাদা গাইড লাইন। সেটা অবশ্যই তাদের বোধগম্য ও ব্যাবহার উপযোগী করতে হবে।
ন্যায্য ভ্যাট আদায়ের সিস্টেম উন্নয়ন ও দেশে সর্বমোট আদায়যোগ্য ভ্যাট এর পরিমাণ নির্ধারণ না করে বিভিন্ন সময়ে চটকদার শব্দের ব্যবহার করে ছেলে ভোলানো গল্প বলছি। ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি গানের সুরে ব্যবসায়ীদের ভয় দেখানোর জন্য বর্গী আসার কথা বলছি কিন্তু এই ধরনের গানে বর্তমানের ডিজিটাল বাচ্চারা ঘুমায় না, আর ব্যবসায়ীরা মনে করছেন বর্গী আসলেও সেটা তো আর আগের মতো ভয়ংকর নয়। বর্তমানের বর্গীদের সামান্য কিছু দিলেই শান্ত হয়ে চলে যায়। সেই বর্গিকে দেওয়া অংশ তো আর পকেট থেকে দেন না, সেটা সেভ করতে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তা অধিকার ক্ষুন্ন করে।
অটোমেশন, ডিজিটাল বা স্মার্ট যে নাম বা পদ্ধতি নিয়ে যত মন ভোলানো বিজ্ঞাপন দিচ্ছি। যা শুধু উপর মহলকে খুশি করতে চেষ্টা করা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি যাই হোক ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও পূর্বের তুলনায় ভ্যাট আদায় বাড়লেও, ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
বিগত বত্রিশ বছরে তৈরি হয় নাই সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ভ্যাট সিস্টেম উন্নয়ন করতে। যেখানে কেউ ন্যায্যতা প্রশ্ন করতে পারবে না। গ্রহণযোগ্য ভ্যাট সিস্টেমে ভ্যাট প্রদান করে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত হবেন যে আর কোন বর্গীর ভয় দেখাতে আসবে না। তিনি সেই নিশ্চয়তা পেলে তৈরি করবেন নতুন নতুন শিল্প কারখানা।
আমরা পারি এবং সেটা করা সম্ভব। আমরা এমন এক প্রজন্মের উত্তরসূরি যারা বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রশিক্ষিত বন্দুকধারীকে ধরাশায়ী করে দেশকে মুক্ত করেছেন। জীবনের একটাই অর্থ খুঁজেছেন এক ভরাট কণ্ঠের উচ্চারণ শুনে "এ বারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম"। জাতির পিতা স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম আলাদা ভাবে বলার অর্থ আগে স্বাধীনতা আনতে হবে, তারপর আসবে অর্থনৈতিক মুক্তি। নতুন করে অর্থনীতি মুক্ত করার ডাক দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ দুই সংগ্রামের ডাক তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ দিয়েছেন। উনার সুযোগ্য কন্যা ক্লান্তিহীন ভাবে অর্থনীতির মুক্তির যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। কোন প্রাপ্তির আশা ছাড়া এগিয়ে আসতে হবে এ প্রজন্মের যোদ্ধাদের।
মো. আলীমুজ্জামান: ভ্যাট বিশেষজ্ঞ