আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশে-বিদেশে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। তারা বলেছেন, নির্বাচন বানচাল করে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ ও অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধীরা এই চক্রান্তে জড়িত। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ৫০ বছর পূর্তি ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ উপলক্ষ্যে চলমান বিশেষ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্থাপিত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর গতকাল রবিবার সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এ কথা বলেন।
‘শাস্তি দিতে আইন দরকার’: আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার বিরুদ্ধে যারা কথা বলে, তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য নতুন আইন করতে হবে। মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ না থাকলে রাষ্ট্র হুমকির মুখে পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি, ল কমিশন নাকি এ ধরনের একটি আইনের প্রস্তাব দিয়েছে। জাতিকে নিরাপদ রাখার জন্য আইনটি যাতে এই সংসদে পাশ করা যায়, সেই আহ্বান জানাব। তিনি বলেন, সংসদ অকার্যকর করার জন্য গত দুটি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। মহলটি বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত করছে।
‘এই সংসদেই ইনডেমনিটি বিল পাশ হয়েছে’: আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমরা দেখেছি, সংসদকে অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা ও অকার্যকর করার জন্য স্বৈরাচারী সরকার যত রকম পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন সবই নিয়েছে। স্বৈরাচারী সরকার সংসদীয় রীতিনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। এই সংসদেই ইনডেমনিটি আইন পাশ হয়েছে। আবার এই সংসদেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই ইনডেমনিটি বাতিল হয়েছে।
‘তারা ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে’: আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজামান খান বলেন, গণতন্ত্র রক্ষা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার সব সময় কাজ করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার দেশের সব কার্যক্রম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করছে। অথচ স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
‘এই সংসদ জাতির ঠিকানা’: কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই সংসদ আমাদের সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। এই সংসদকে বলা হয় ‘হাউজ অব দ্য ন্যাশন’, অর্থাত্ সমগ্র জাতির ঠিকানা। এই সংসদকে কার্যকর করতে জাতির পিতা তার জীবনের সর্বস্ব দিয়ে গেছেন। ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জীবিত করতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
‘ওসমানী না বুঝে অনেককে সনদ দেন’: মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, জেনারেল ওসমানীকে বঙ্গবন্ধু ভালোবাসতেন। তার ওপরে সব দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বীর উত্তম, বীর বিক্রম—সবকিছু দেওয়ার দায়িত্ব দেন। না বুঝে অনেককে মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়েছেন তিনি। জেনারেল ওসমানী তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দিতে মোশাররফ হোসেনকে আমন্ত্রণ জানান বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘ওসমানী আমাকে টেলিফোন করে বলেন, আমি জনতা লীগ (জাতীয় জনতা পার্টি হবে) করেছি, আপনি আমার দলে থাকবেন। আমি বললাম, কী বললেন? আমি তো দল করি। আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোন দল করেন? আমি বললাম, আওয়ামী লীগ করি। তিনি বললেন, আওয়ামী লীগ কি এখনো আছে?’
মোশাররফ বলেন, ‘এই মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে কে? জেনারেল ওসমানী। আমি প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেছি। ভেতরে ঢুকেছি। আমি দুই বার আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গেছি।’
ফিরোজ রশীদ যা বললেন: জাতীয় পার্টির (জাপা) কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, সংসদের অনেক অর্জনের সঙ্গে দুর্বলতাও আছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনায় আজ পর্যন্ত একটা কমিশন করা যায়নি। কারা জড়িত ছিল, জাতি যদি জানতে না পারে, তাহলে ইতিহাসের ভগ্নাংশ রেখে লাভ নেই। বঙ্গবন্ধুকে মারা ছিল বিশাল ষড়যন্ত্রের কাজ। ডালিম, ফারুক, রশীদ গিয়ে করল, তা নয়। এর পেছনে ষড়যন্ত্র ছিল, তা আপনারা (সরকারি দল) বের করলেন না। তিনি বলেন, চরম বামপন্থি, চরম দক্ষিণপন্থি—তাদের নাম উচ্চারণ করা যাবে না। কারণ, সবাই নৌকায় উঠে বসে আছে। নৌকা তো আপনারা (আওয়ামী লীগ) বাইবেন। তারা উঠে বসে আছেন।
ফিরোজ রশীদ আরো বলেন, ‘পাকিস্তান আমলে দেখা যেত, পাত্র যদি রাজনীতি করত তাহলে বিয়ে দিত না। কারণ, সে খাওয়াবে কী? খাওয়াতে হলে পত্রিকা অফিসে চাকরি করতে হবে, না হলে বটতলার উকিল হতে হবে, না হয় মুদি দোকানদার হতে হবে অথবা এজিবির কেরানিগিরি। কিন্তু এখন যদি শোনে যে পাত্র সরকারি দল করে, তাহলে বলে আলহামদুলিল্লাহ। কারণ সে অনেক কিছু করতে পারবে!’ জাপার এই জ্যেষ্ঠ এমপি আরো বলেন, জাতি আজ দুই ভাগে বিভক্ত। নিরপক্ষে কেউ নেই। আগে রাজনীতি নেশা ছিল, ভালোবাসা ছিল। জীবন বাজি রেখে রাজনীতি করত। আর এখন রাজনীতি সবচেয়ে বড় পেশা।
মোকাব্বির খানের বক্তব্য: গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, এখনো জাতীয় সংসদে দুর্নীতিবাজ, অর্থ পাচারকারী ও লুটেরাদের রক্ষার জন্য ইনডেমনিটির মতো কালো আইন পাশ হয়। এটা লজ্জার। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের, রাজাকার-আলবদরদের সংসদ সদস্য করে সংসদকে কলুষিত করা হয়েছে। জনগণের মালিকানা ছিনতাই করে গঠিত হচ্ছে জাতীয় সংসদ। তিনি বলেন, আজকের জাতীয় সংসদে জাতির পিতার দর্শন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা অনেকাংশেই অনুপস্থিত।
‘রাস্তায় নামবেন’ শামীম ওসমান: আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন, ‘ষড়যন্ত্র চলছে, হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ’৭৫ সাল আর হবে না। পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এবার প্রধানমন্ত্রীর কথাও শুনব না। আমরা যারা সংসদ সদস্য আছি, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আছি, বাংলাদেশ ও নেত্রীকে বাঁচানোর জন্য এবং মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর জন্য মাথায় কাফনের কাপড় পরে মৃত্যুর সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্ট নিয়ে রাস্তায় নামব।’
অন্যরা যা বললেন: বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী বলেন, বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তিনি জাতিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। সাবেক মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, বাংলাদেশকে এখন বিশ্বের অনেক দেশ অনুকরণ করে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, আজকে বাংলাদেশ যে পর্যায়ে চলে গেছে, জনগণের কাছে ভোট চাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তার পরও কেন চাইতে হয়? চাইতে হয় সেই কারণে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একটা বিরাট প্রজন্ম ভুল তথ্য নিয়ে এই বাংলাদেশে বেড়ে উঠেছিল। তারা বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস জানত না, এই দেশের কোনো ইতিহাসই সঠিকভাবে জানত না।