এই গরম হইতে কবে মিলিবে পরিত্রাণ?

চৈত্র মাস! সর্বনাশ! স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছেন, ‘প্রহর শেষের আলোর রাঙা সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।’ চৈত্র মাস নানা কারণেই সর্বনাশা। এই মাসের সূত্রেই বাংলা ভাষায় আসিয়াছে ‘চৈতা পাগল’ শব্দটি। চৈত্র মানেই চরম গরম, চৌচির করা মাঠ-ঘাট। কাঠফাটা রোদ্দুর, চাতকের বুকফাটা চিত্কার। চৈত্রের দাবদাহে জীবন হইয়া পড়ে ওষ্ঠাগত। প্রকৃতির রুক্ষ ভাব, তাতিয়া উঠা রোদ ও লু হাওয়ায় মানুষ হইয়া পড়ে অতিষ্ঠ। এইবার চৈত্র মাসের শুরুটা ছিল অনেকটাই নাতিশীতোষ্ণ। না গরম, না ঠান্ডা; কিন্তু হঠাত্ করিয়া বিদায়বেলায় চৈত্র ধারণ করিয়াছে তাহার রুদ্র রূপ। আবহাওয়াবিদরা বলিতেছেন, গরমের কেবল শুরু হইল। সামনের দিনগুলিতে আরো গরম বাড়িবে। এইবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়াইয়া যাইতে পারে। আশঙ্কার খবর হইল, আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা খুবই কম। আবার বৃষ্টি হইলেও তাহাতে দিন ও রাত্রের তাপমাত্রায় তেমন হেরফের হইবে না।

আবহাওয়াবিদদের গরম বাড়িয়া যাইবার খবরে বিচলিত বোধ না করিয়া পারা যায় না। অবশ্য আমরা এমনিতেই নানা রকম গরমের মধ্যে রহিয়াছি। ইউক্রেন যুদ্ধের পর হইতেই এই পৃথিবীতে বসন্তকাল যেন উধাও হইয়া গিয়াছে। এই যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ধস তৈরি করিয়াছে তাহার উত্তাপ বিশ্ববাসী আজ ঠিকই টের পাইতেছে। তাইওয়ানসহ আরো একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধের পদধ্বনি শুনা যাইতেছে। কেহ কেহ বলিতেছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথাও। এই বারুদের উত্তাপ আর কত বাড়িবে? অর্থনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাজনীতিও ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো বলা হইতেছে, সামনের দিনগুলিতে রাজনৈতিক উত্তাপ আরো বাড়িবে। অর্থাত্ শুধু প্রকৃতি নহে, আজ চারিদিকে শুধু গরম আর গরম। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার গরম। ঈদ ও পহেলা বৈশাখের বাজার গরম। ইহা ছাড়া এই মুহূর্তে বিশ্বের শক্তিমানদের মাথাও গরম। কথায় কথায় তাহারা একে অপরকে হুমকি দিতেছে। সীমানা লঙ্ঘন করিবার ঘটনাও ঘটিতেছে। পারমাণবিক ডুবো-ড্রোনের পরীক্ষা যেমন চালানো হইতেছে, তেমনি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন মোতায়েনও চলিতেছে। তবে শুধু এই অত্যাধুনিক যুগ নহে, সেই লৌহ-প্রস্তর যুগও ছিল গরম। এখন গান পাউডারের যুগ। পারমাণবিক অস্ত্রের যুগ। এই যুগেও কে কত গরম দেখাইতে পারে তাহারই চলিতেছে নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা।

আমরা দাবি করি, আমরা আজ সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছাইয়া গিয়াছি। অভাবনীয় উন্নতি হইয়াছে আমাদের; কিন্তু এখনো এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ দরিদ্র, অভাবী ও অভুক্ত। অর্ধাহারে-অনাহারে মারা যাইতেছে লাখো বনি আদম। আমরা যে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন তথা যুদ্ধবিগ্রহে অর্থ ব্যয় করিতেছি, তাহার কিয়দংশ এই সকল ভুখা-নাঙ্গা মানুষের জন্য ব্যয় করিতে পারিলেও এই পৃথিবী হইত অনেকটাই বসবাস উপযোগী ও সহনশীল; কিন্তু সভ্যতার উচ্চশিখরে উঠিয়া এই আমরা কোথায় যাইতেছি? আমাদের কর্মকাণ্ড ও চিন্তাভাবনা দেখিয়া অনেক সময় মনে হয়, আমরা সেই লৌহ-প্রস্তর কিংবা গুহা যুগেই রহিয়া গিয়াছি!

প্রকৃতির গরম প্রাকৃতিক নিয়মেই চলিয়া যাইবে। গ্রীষ্মকাল অতিক্রম করিয়া আসিবে বর্ষাকাল; কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট যাবতীয় গরম হইতে আমাদের কবে মুক্তি মিলিবে? কবে পৃথিবী হইবে যুদ্ধবিগ্রহমুক্ত, দ্বন্দ্ব-সংঘাতহীন? অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, এই গরম হইতে আমাদের পরিত্রাণ নাই। ইহা আমাদের সহ্য করিয়া যাইতে হইবে। এই নির্বাচনি বত্সরে এই গরম শেষ পর্যন্ত কত ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পায়, তাহাই আজ উদ্বেগের সহিত দেখিবার বিষয়।