দারিদ্র্য, সংসারে অশান্তি, খাদ্যের অভাব—এমন নানা কারণে ঘর ছাড়ে শিশুরা। এই শিশুদের ৯৫ শতাংশই শ্রমে জড়িত। ৬৪ শতাংশ শিশুই পরিবারে আর ফিরে যেতে চায় না এমন তথ্য প্রকাশ পায় ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ শীর্ষক নতুন জরিপে।
সোমবার (১০ এপ্রিল) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কার্যালয়ে ইউনিসেফের সহায়তায় এই জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা পথশিশুদের এই বাস্তব চিত্র দেশের পথশিশুদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিমালা প্রণয়ন ও কর্মসূচি গ্রহণে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। এক দিনে পরিস্থিতি বদল হবে না, তবে সবাই মিলে কাজ করলে তা সম্ভব। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী শামসুল আলম। সম্মানিত অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট। আরও উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব শাহনাজ আরেফিন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক আতিয়ার রহমান। ব্যুরোর পরিচালক মাসুদ আলম জরিপের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
শামসুল আলম বলেন, উন্নয়নের পেছনে যে কান্না আছে, তা এই প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। শিশুদের স্বাস্থ্যগত বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এই জরিপ আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দারিদ্র্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা এবং দেশের আটটি বিভাগের স্থানে (যেসব স্থানে পথশিশুর আনাগোনা বেশি) ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ শিশুর কাছে সরাসরি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। জরিপে রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশুদের মোট সংখ্যা না থাকলেও ইউনিসেফ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংখ্যা ১০ লক্ষাধিক হতে পারে। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো বেদনাদায়ক। এই বিষয়গুলো কেবল আমাদের কাজ করার জায়গাগুলো দেখিয়ে দেয় না, রাস্তায় বসবাস ও কাজ করা শিশুদের জন্য আমাদের সহানুভূতি এবং সহায়তার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে।
যেসব শিশু তাদের পরিবারসহ বা পরিবার ছাড়া বসবাস বা জীবিকা অর্জনের জন্য বেশির ভাগ সময় রাস্তায় কাটায়, তাদের রাস্তাঘাটে বসবাসকারী শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই শিশুদের বেশির ভাগই ছেলে (৮২ শতাংশ) এবং তাদের বেশির ভাগ দারিদ্র্যের কারণে বা কাজের সন্ধানে রাস্তায় আসে। প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ৬ শতাংশ শিশু এতিম অথবা তাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন কি না, তা তাদের জানা নেই। জরিপে জানা যায়, এই শিশুদের প্রতি তিন জনের মধ্যে প্রায় এক জন (৩০ শতাংশের বেশি) জীবনের সবচেয়ে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, যেমন—ঘুমানোর জন্য বিছানা এবং নিরাপত্তা ও স্বস্তির জন্য দরজা বন্ধ করে রাখা যায় এমন একটি ঘর থেক বঞ্চিত। তারা খোলা জায়গায় থাকে ও ঘুমায়। প্রায় অর্ধেক শিশু মাটিতে ঘুমায় শুধু একটি পাটের ব্যাগ, শক্ত কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরো বা একটি পাতলা কম্বল নিয়ে। প্রায় ৭ শতাংশ শিশু সম্পূর্ণ একা ঘুমায় এবং ১৭ শতাংশ শিশু কয়েক জন একসঙ্গে মিলে ঘুমানোর মাধ্যমে সুরক্ষা ও স্বস্তি খোঁজে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা তিনটি ঘটনার একটি (৩০ দশমিক ৪ শতাংশ) রাতে তাদের ঘুমের সময় ঘটে থাকে।
লজ্জাজনক নির্যাতন ও হয়রানি :রাস্তায় বসবাসকারী শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয় পথচারীদের দ্বারা। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে আট জনই পথচারীদের দ্বারা নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগ করে। জীবিকা নির্বাহের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ, ভিক্ষাবৃত্তি বা চায়ের দোকানে, কারখানা ও ওয়ার্কশপে কাজ করতে বাধ্য হওয়া এই শিশুরা প্রতিদিন আঘাত ও সহিংসতার শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের এক-তৃতীয়াংশ শিশু কাজ করার সময় আহত হওয়ার কথা জানায়, আর অর্ধেক শিশু জানায় সহিংসতার শিকার হওয়ার কথা। রাস্তায় থাকা শিশুদের প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জন (৭১ দশমিক ৮ শতাংশ) পড়তে বা লিখতে পারে না, যা জীবনভর তাদের জন্য প্রতিবন্ধক হিসেবে রয়ে যায় এবং তাদের নির্মম ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। জরিপে অংশ নেওয়া শিশুদের অর্ধেকের বেশি জানায়, জরিপের আগে তিন মাসের মধ্যে তারা অসুস্থ হয়েছিল। ঐ সময় তারা জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা ও পানিবাহিত রোগে ভোগে।
জরিপ থেকে আরও জানা যায়, রাস্তায় থাকা শিশুদের সেবা প্রদান করে এমন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে তারা যে সহায়তা পেতে পারে, সে সম্পর্কে বেশির ভাগ শিশুই (৭৯ শতাংশ) অবগত ছিল না।