পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ

দেশে দারিদ্র্যের হার কমে এলেও বৈষম্য বেড়েছে

দেশে দারিদ্র্যের হার কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি বৈষম্যও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একদিকে আয়ের বৈষম্য, অন্যদিকে ভোগের বৈষম্য—দুটিই বেড়েছে।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল বুধবার ‘খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২’-এর ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে।

জরিপের ফলাফল থেকে দেখা যায়, ২০২২ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা পল্লি এলাকায় ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে অতিদারিদ্র্যের হার গড়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে, যা পল্লি এলাকায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ, দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্য দুটোই কমেছে।

অন্যদিকে বৈষম্য আগের চেয়ে বেড়েছে। বৈষম্য নির্ধারণে গিনি সহগের পরিমাণ করা হয়েছে। ‘শূন্য থেকে এক’ পর্যন্ত এই সহগ পরিমাপ করা হয়। এই সহগ যদি শূন্য হয়, সে ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হয় কোনো বৈষম্য নেই। সহগের মান যত একের কাছাকাছি যায়, ততই বৈষম্য বাড়ে।  

২০২২ সালের জরিপে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, আয়ের জন্য গিনি সহগের মান শূন্য দশমিক ৪৯৯, যা ২০১৬ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৮২ এবং ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮। অন্যদিকে ২০২২ সালে ভোগব্যয়ের জন্য গিনি সহগের মান শূন্য দশমিক ৩৩৪, যা ২০১৬ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩২৪ এবং ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৩২১। অর্থাৎ আয় ও ভোগব্যয় উভয় ক্ষেত্রে বৈষম্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

আগারগাঁওয়ের বিবিএস মিলনায়তনে আয়োজিত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম।

দেশে বৈষম্য বাড়ার বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এটা গ্রহণযোগ্য নয়, বৈষম্য কমাতে হবে। পুরোনো বিশ্লেষণ অনুযায়ী বলা হতো, অর্থনীতির ‘টেকঅফ স্টেজে’ বৈষম্য বাড়ে। কিন্তু আমি মনে করি, জনগণ সুবিধাপ্রাপ্তি থেকে পিছিয়ে থাকলে বৈষম্য বাড়ে। যেমন পুঁজির অভাবে বাজার বৈষম্য তৈরি হয়, এটা ঠিক আছে। কিন্তু আইনগত কারণেও বৈষম্য বাড়ে। গ্রাম ও শহরের সাংস্কৃতিক বিভাজনের কারণেও বৈষম্য বাড়ে। সরকার যে উন্নয়ন করছে, সেগুলোতে যদি সাধারণ মানুষের ‘এক্সেস’ না থাকে, সেক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ে। বর্তমান সরকার শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় সেভাবে বৈষম্য বাড়েনি বলে তিনি মনে করেন। কোভিডের সময় বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ, দরিদ্র মানুষের সহায়তা এবং কলকারখানা সচল থাকায় দেশে দারিদ্র্যে হার কমে আসায় ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন। এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘যেটুকু গিনি সহগ বেড়েছে, তাতে বৈষম্য খুব একটা বেড়েছে, সেটা বলা যাবে না। আমি মনে করি, বৈষম্য স্থিতিশীল রয়েছে।’ আয় বাড়লেও মানুষের খাদ্য গ্রহণের মানে বড় উন্নতি হচ্ছে না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন আয়ের বড় অংশ মানুষ খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় করছে। যেমন কক্সবাজারে ঘুরতে যাচ্ছে, বিদেশে চিকিৎসা করতে যাচ্ছে।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন এনডিসি, পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য ড. মো. কাউছার আহমেদ, বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য ও সমতা বিভাগের প্রাকটিস ম্যানেজার জিমেনা ভি. ডেল কারপিও, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন। জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্মসচিব ড. দিপংকর রায়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য, আয়, ব্যয়, ভোগ সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রদানের জন্য একটি স্বতন্ত্র জরিপ হলো খানার আয় ও ব্যয় জরিপ। এই জরিপের মাধ্যমে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অভিবাসন, রেমিট্যান্স ইত্যাদি বিষয়েও তথ্য সরবরাহ করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফ, প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য ভাতা, দরিদ্রদের জন্য আয়বর্ধক কর্মসূচি, আশ্রয়ণ প্রকল্প, কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি ইত্যাদি দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখেছে।