তিনি মানবহৃদয়ে বাঁচিয়া থাকিবেন

কী সৌভাগ্য তাহার? নিজের প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিলেন তিনি। সহকর্মী ও সুহৃদেরা যখন তাহাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর লইয়া যাইতে চাহিলেন, তখন তিনি তাহাদের হতাশ করিয়া বলিলেন, ‘বিদেশে চিকিৎসা করিতে যাওয়ার মানে দাঁড়াইবে নিজের দেশের চিকিৎসাকে ছোট করিয়া দেখা।’ বিনা খরচে কিডনি প্রতিস্থাপন ও বিদেশে চিকিৎসার অনুরোধ তিনি নিঃশঙ্কচিত্তে ফিরাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারার্থে একজন দেশদরদি ও দরিদ্রবান্ধব চিকিৎসক, সমাজ ও রাজনীতিসচেতন মহান মুক্তিযোদ্ধা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাহার পরিচয় ছিল একজন বিকল্প ধারার স্বাস্থ্য আন্দোলনের সংগঠক হিসাবে। তিনি আর কেহ নন, বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্যময়। ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রা-উজানে তাহার জন্ম হইলেও তিনি বড় হন ঢাকা শহরেই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হইতে একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি লন্ডন যান এবং সেখানকার রয়্যাল একাডেমি হইতে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস সম্পন্ন করেন। তিনি বিদেশেই থাকিয়া যাইতে পারিতেন। এমনকি ইচ্ছা করিলে ঢাকায় সার্জারি প্র্যাকটিশনারদের অন্যতম একজন হইতে পারিতেন; কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া গ্রামে চলিয়া যান এবং গড়িয়া তোলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ইহা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তিনি ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনিই প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের চিকিৎসাসেবার জন্য ভারতের ত্রিপুরায় গড়িয়া তুলেন ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত চিকিৎসকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করা ও হাসপাতালের জন্য ঔষধসহ চিকিৎসা-সরঞ্জাম সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে তাহার ভূমিকা ছিল অনন্য। যাহাদের পূর্বে কোনো প্রশিক্ষণ ছিল না—এমন নারীরা কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ লইয়া তাহার এই হাসপাতালে সেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সেই হাসপাতালের অভিজ্ঞতা হইতেই তিনি ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে গড়িয়া তুলেন জনস্বাস্থ্য কেন্দ্র। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা যে কয়েক দিন বা কয়েক মাসের প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব তাহা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রমাণ করে। সেই অভিজ্ঞতার কথা বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ল্যানসেটে প্রবন্ধকারে প্রকাশিত হইলে এই ধারণাটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পায়। তাহারই ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এবং ইউএন কনফারেন্সের মাধ্যমে গ্লোবাল ইউনিভার্সাল প্রাইমারি কেয়ার প্রকল্পের ঘোষণা দেয়। এই ক্ষেত্রে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর অবদান বিশ্বব্যাপী অবিস্মরণীয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ছিলেন একজন বিশ্বনন্দিত জনস্বাস্থ্যবিদ। ১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে যে জাতীয় ঔষধনীতি গ্রহণ করা হয়, তাহার ফলে বাংলাদেশ ঔষধশিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। বর্তমানে ইহাতে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ ঔষধ রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা লাভ করিয়াছে। এমনকি তৈরি পোশাকের পরই এই ঔষধশিল্পের সম্ভাবনা এখন দিনদিন বাড়িতেছে। বলা বাহুল্য, এই জাতীয় ঔষধনীতির মূল পরিকল্পনাকারী ও কারিগর ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। অসহায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য তাহার হৃদয়টা ছিল অনেক প্রশস্ত। মানব হৃদয়ে ভালোবাসা অর্জনের চাইতে বড় অর্জন আর কী হইতে পারে? তাহার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা হইল—রিসার্চ : আ মেথড অব কলোনাইজেশন, পলিটিকস অব অ্যাসেনশিয়াল ড্রাগস ইত্যাদি। তিনি আমাদের স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি নানা গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন চিরকাল স্পষ্টভাষী। দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো এত বড় বিশাল সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কর্ণধার হইয়াও তিনি আজীবন সাদাসিধা জীবন যাপন করিয়া গিয়াছেন। তিনি চাহিলে তাহার চিকিৎসা পেশা দিয়া নিজের জীবনকে সুখসাগরে ভাসাইয়া দিতে পারিতেন; কিন্তু ভোগবাদী এই বিশ্বে পৃথিবীর মানুষ যখন শুধু নিজের সুখ অনুসন্ধানেই পরিব্যাপ্ত, তখন তিনি বাছিয়া নেন গরিববান্ধব সেবাপ্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার সংকল্প। এই মেধাবী মানুষের এমন ত্যাগ সত্যিই বিরল। তাহার মৃত্যুতে জাতি হারাইল একজন সূর্যসন্তানকে। আমরা এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিকের মৃত্যুতে তাহার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতেছি। এই কিংবদন্তি প্রজন্ম হইতে প্রজন্মান্তরে মানব হৃদয়ে বাঁচিয়া থাকিবেন। তাহার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তাহার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি আমরা জানাই গভীর সমবেদনা।