যশোরের কেশবপুরে সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে ৪ হাজার ৬৫৮ মাছের ঘের গড়ে উঠেছে। এসব ঘের মালিকরা ৫৯টি সরকারি খাল দখলে নিয়ে মাছ চাষ করছে। ঘের ব্যবসায়ীরা জমির মালিক কৃষকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া টাকা সময়মত পরিশোধ না করাসহ পানি নিষ্কাশন করে না বলে কৃষকরা বোরো আবাদ থেকে বঞ্চিত হয়। এ কারণে কৃষকরা নতুন করে ঘের ব্যবসায়ী খুঁজে বেশি টাকায় চুক্তিবদ্ধ হয়। এ নিয়ে ঘের ব্যবসায়ীদের মধ্যে হামলা-মামলা-সংঘর্ষ লেগেই আছে। এলাকাবাসীর শঙ্কা এ থেকে বড় ধরনের সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারে।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য মতে, উপজেলায় ছোট বড় মিলে ৪ হাজার ৬৫৮টি মাছের ঘের রয়েছে। যার মধ্যে কৃষি জমি প্রায় সাড়ে ৭ হাজার হেক্টর। এসব ঘেরে সরকারি খাল রয়েছে ৫৯টি। যার আয়তন ৩৯৪ হেক্টর। প্রতিবছর এসব ঘেরে দেশি মাছ ছাড়াও গলদা, বাগদা, সাদা মাছ, কুচিয়া ও কাঁকড়া উৎপাদন হয়। ২০১৯ সালের ভবদহ এলাকায় মৎস্য ঘের স্থাপন নীতিমালায় বলা রয়েছে, একজন ব্যক্তি ১৫ হেক্টর ও সমবায় ভিত্তিতে ৫০ হেক্টরের বেশি জলাধার নিয়ে মৎস্য ঘের করতে পারবে না এবং চুক্তিপত্রে শতভাগ জমির মালিকের স্বাক্ষর থাকতে হবে। কিন্তু এ নীতিমালা উপেক্ষা করে অধিকাংশ ঘের গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে অনেক ব্যবসায়ীর ১৫-২০টি করে মাছের ঘের রয়েছে।
জানা যায়, কেশবপুর ও মনিরামপুর উপজেলার আশাননগর বিলের পরেশ ও ভবেন মণ্ডলের মাছের ঘেরটির ডিডের মেয়াদ ১৩ এপ্রিল শেষ হয়। জমির মালিকরা ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বিশ্বাসকে ঘেরটি ডিড করে দেয়। এ ঘটনা জানতে পেরে চলতি মাসের শুরুতে পরেশ মণ্ডল ও ভবেন মণ্ডল সন্ত্রাসী ভাড়া করে ওই ঘেরে মাছ ছেড়ে দেয়।
এদিকে, পাঁজিয়া ইউনিয়নের সাগরদত্তকাটি আমতলা বিলের মাছের ঘেরটিতে ২০১৬ সাল থেকে ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বিশ্বাস মাছ চাষ করছেন। গেল বছরের ৩০ চৈত্র ঘেরের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কৃষকরা পুনরায় কামরুজ্জামান বিশ্বাসকে ডিড করে দেয়। আবার কিছু কৃষক অপর ঘের মালিক কেরামত গাজীকে ডিড করে দেয়। এনিয়ে দুই ঘের মালিকের মধ্যে হামলা-মামলা লেগেই ছিল। একই বছর সেলিমুজ্জামান আসাদ নামে এক ব্যবসায়ীর মূলগ্রামের ঘেরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আব্দুর রাজ্জাক নামে আরেক ব্যবসায়ী জমির মালিককে ম্যানেজ করে প্রভাব খাটিয়ে ঘেরটি দখলে নিয়ে নেয়।
২০১৮ সালে বলদহালি বিলের ৪০০ বিঘার মাছের ঘের সুলতান আহমেদের কাছ থেকে প্রভাবশালী এক নেতা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জোরপূর্বক দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠে। শুধু এ চারটি ঘের নয় কেশবপুরের অধিকাংশ ঘের নিয়ে ব্যবসায়ীরা দখল-পাল্টা দখল খেলায় মেতে উঠেছে। এতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
ঘের ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বিশ্বাস বলেন, আশাননগর বিলের ৪৭৫ বিঘা জমির মাছের ঘেরটি জমির মালিক কৃষকরা আমার নামে ডিড করে দেয়। একথা জেনে সাবেক ঘের মালিক পরেশ মণ্ডল ও ভবেন মণ্ডল সন্ত্রাসী ভাড়া করে এনে মাছ ছেড়ে দেয়। ১৪ এপ্রিল ওই ঘেরে মাছ ছেড়ে দেব।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সজিব সাহা বলেন, উপজেলার ঘের ব্যবসায়ীরা সরকারি নীতিমালা মানেন না। ঘেরের বিরোধ নিয়ে মাঝে মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিযোগ আসে। এ সময় প্রতিবেদন দেওয়া ছাড়া করনীয় কিছু থাকে না। হাতেগোনা কয়েকটি চিংড়ি ঘের ব্যতীত অধিকাংশই অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। ঘের ব্যবসায়ীরা সরকারি রাস্তা ঘেরের বেড়িবাঁধ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এতে রাস্তা ধসে নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এম এম আরাফাত হোসেন বলেন, সরকারি খাল দখলমুক্ত করতে ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। নির্দেশনা পেলেই এ সমস্ত খাল দখলমুক্ত করা হবে। এছাড়াও ঘেরের মালিকানা বিরোধ নিয়ে অভিযোগও পাওয়া যায়।