এ বছর পয়লা বৈশাখ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রসঙ্গটি যতটা আলোচনায় এসেছে—তা অবশ্যই ভাবার বিষয়। কারণ নববর্ষ উদযাপন কিংবা পয়লা বৈশাখ বাঙালির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। এই বিষয় নিয়ে রাজনীতি করাটা খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার। এগুলো করা উচিত নয়। বাংলাদেশ এজটি অসাম্প্রদায়িকতার দেশ।
আমরা বাঙালি, বাংলা আমাদের ভাষা। এগুলো সব একসূত্রে গাঁথা। আমি মনে করি ভাষা আমাদের অহংকার। একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে আমরা আমাদের ভাষার স্বাধীনতা পেয়েছি। ঠিক তেমনি ২৬ শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস, ১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। এই দিনগুলো আমাদের জন্য অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম সম্প্রদায় যেমন ঈদ উদযাপন করে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা যেমন পূজা উদযাপন করে। খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—তারাও তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, আমি হিন্দু দেখি, মুসলিম দেখি, খ্রিস্টান দেখি, কিন্তু মানুষ তো দেখি না। আগে আমাদের মানুষ হতে হবে। আসলে ধর্ম যার যার উৎসব সবার।
স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এগুলোর পরে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত পয়লা বৈশাখ। সবাই মিলে নববর্ষকে উদযাপন করা। ঈদ যেমন মুসলিমরা করে, পূজা যেমন হিন্দুরা করে, কিন্তু নববর্ষটা সবাই উদযাপন করে থাকে। এটা সবাই পালন করে। এবং এটাই করা উচিত। এখানে হিন্দু-মুসলিম বলে কথা নেই। এত বছর পর এসে এটাকে যদি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হয়—মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে কি হবে না, কিংবা রোজার মধ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে না—এটা খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার। এবং মনে করি যে মঙ্গল শোভাযাত্রা যেমন দরকার এটা বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্য, একই সঙ্গে রমজান মাসে ইফতার মাহফিল হয় সেটাও আমাদের প্রয়োজন।
কেন আমরা এখন মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা করব। নববর্ষ উদযাপন কিংবা পয়লা বৈশাখ উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নববর্ষ উদযাপন কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা ছায়ানটের বর্ষবরণ আমাদের মেনে নিতে হবে। হাজারো প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আমাদের সন্জীদা খাতুন রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে থাকেন। একদিন হয়তো সন্জীদা খাতুন থাকবেন না, অন্য কেউ থাকবে না, কিন্তু এটা প্রজন্ম পরম্পরায় পালিত হতেই থাকবে। আমরা ছোটবেলায় পঞ্জিকার ব্যবহার দেখেছি। আমার বাবা-মা পঞ্জিকা ব্যবহার করতেন। রাশিফল মানা হতো। আমি দেখেছি, আমাদের এলাকার হাটবাজারে দোকানে দোকানে পয়লা বৈশাখে চৈত্র সংক্রান্তিতে হালখাতা অনুষ্ঠিত হতো।
দোকানদাররা যারা টাকাপয়সা পেত কাস্টমারদের কাছে, তা তারা ওঠানোর চেষ্টা করত হালখাতার মাধ্যমে। পয়লা বৈশাখে মেলা বসত। সবাই আনন্দ নিয়ে মুড়ি-মুড়কি, মিষ্টি বিতরণ করত। সেগুলো কিন্তু এখনো ভুলিনি আমরা। এখনো বাংলাদেশের সব জেলায়, মফস্বল শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে বৈশাখী মেলা ও হালখাতা উৎসব পালিত হয়। কিন্তু আমরা নগরে বসে সেগুলো টের পাই না।
এ দিনে মেয়েরা শাড়ি পরে, ছেলেরা পাঞ্জাবি পরে আনন্দের সাথে দিনটি উদযাপন করে। এখানে কোনো ধর্মীয় ব্যাপার নেই। বাংলা বর্ষবরণ উৎসব উদযাপনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, উদীচীসহ যে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আছে তাদের উত্সাহিত করা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে যে মঙ্গল শোভাযাত্রাটা বের হয় এবং এবারও হবে।
একদিকে রোজা, মানুষ ইফতার করবে, সিয়াম সাধনা করবে এবং একই সঙ্গে নববর্ষ উদযাপিত হবে। এটা কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা বাঙালি উৎসব। এটা বাঙালির ঐতিহ্য। মঙ্গল শোভাযাত্রা আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতির মঙ্গলের জন্য উদযাপন করি। এ ব্যাপারে উকিল নোটিশ পাঠানো সত্যিই হাস্যকর। এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের আসলে ভাবতে হবে।
আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে তারাও উদযাপন করে বৈসাবি উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ কিংবা কলকাতায় খুব ঘটা করে নববর্ষ উদযাপন করা হয়। সেটা বাঙালির উৎসব বলেই পরিচিত। সে কারণেই মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল হোক সেটাই আশা করছি। বৈশাখকে আমরা নতুন করে পেতে চাই। প্রিয়তমাকে পেতে চাই। পয়লা বৈশাখের মাধ্যমে নতুন প্রেমও জাগতে পারে। সেটা দেশপ্রেম, জাতিগত প্রেম, সংস্কৃতির প্রতি প্রেম, বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম, পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছের প্রতি প্রেমও হতে পারে। এখন ইলিশ অনেক কমে গেছে। তারপরও পয়লা বৈশাখে ইলিশের নাম বলা হয়। এটা বিশ্ব বাঙালির কাছে পরিচিত। কলকাতার মানুষ বাংলাদেশের ইলিশ মাছ পেলে অনেক খুশি হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর একটি লেখায় আমি দেখেছি, ঢাকা এবং ইলিশ মাছ তাঁর খুবই পছন্দের। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল যেমন প্রিয়, ইলিশ মাছটাও তাদের প্রিয়। বাঙালির পয়লা বৈশাখটাও প্রিয়। তিনি বলেছেন, পয়লা বৈশাখের পান্তা ইলিশ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এটা যেখানে বাঙালি আছে সেখানেই পৌঁছে গেছে। আমি বলতে চাই, চৈতালি মেঘের ডাকে, সুগন্ধি মধুগন্ধি বৈশাখ। বৈশাখকে মধুগন্ধি বৈশাখ বলছি কারণ বৈশাখের পর আসে মধুময় মাস জ্যৈষ্ঠ। আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনা করব।
লেখক: কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব