যাহারা সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকেন, তাহাদের নিকট জনগণ সর্বদা দায়িত্বশীল আচরণ কামনা করিয়া থাকেন। তাহাদের কথাবার্তা ও কার্যকলাপে যাহাতে সামঞ্জস্য বজায় থাকে, সেই দিকেও খেয়াল রাখা আবশ্যক; কিন্তু অনেক সময় দায়িত্বশীল ব্যক্তির তরফ হইতে আমরা কাণ্ডজ্ঞানহীন ও অদায়িত্বসুলভ আচরণ প্রত্যক্ষ করি, যাহা দুঃখজনকই বটে। বিশেষ করিয়া গত এক মাসে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তির বচন বিশ্লেষণ করিলে দেখা যাইবে, তাহারা একেক জন অসংলগ্ন ও অসমন্বিত কথাবার্তা বলিয়াছেন। এই সমন্বয়হীন ও অসংলগ্ন কথাবার্তা তাহার দল বা গোষ্ঠীকে বিব্রত করিতে পারে, তাহা কি তাহারা ভাবিয়া দেখেন? রুলস অব বিজনেস অনুসরণ করিলেও এমনটি হইবার কথা নহে। আবার দেখা যাইতেছে, যিনি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল নন, তিনি সেই মন্ত্রণালয় সম্পর্কে উপযাচক হইয়া বক্তব্য দিতেছেন। এমনকি তাহার যে বিষয়ে গভীর জ্ঞান নাই, তিনি সেই ব্যাপারে জাতিকে নসিহত করিয়া চলিয়াছেন। রাজনীতিবিদ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য বা আচরণ অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত।
কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি তিনি রাজনীতি বা প্রশাসনের যেই হউন না কেন, তাহার দায়দায়িত্বহীন বক্তব্য প্রদান সমীচীন নহে। দেখা যাইতেছে, দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে তাহারা অবিরাম কথা বলিয়া যাইতেছেন। বিভিন্ন সভা-সমিতি-সেমিনারে তাহাদের দায়িত্বের সীমারেখা অতিক্রম করিয়াও বক্তব্য প্রদান করিতেছেন যাহা অশোভনীয়। প্রত্যেকেরই নির্দিষ্ট সীমারেখা ও আচরণবিধি মানিয়া চলা প্রয়োজন। কোনো বক্তব্য প্রদান বা মন্তব্য করিবার ক্ষেত্রে নিজস্ব পরিমণ্ডল বিবেচনা করা তথা সীমারেখা মানিয়া চলা একান্ত আবশ্যক। অতি উত্সাহী হইয়া বাড়তি কথা না বলাই বাঞ্ছনীয়। কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি কেন অতিরিক্ত কথা বলিবেন? আমাদের মনে রাখিতে হইবে, মন্ত্রিসভার নিকট মন্ত্রীরা সামষ্টিকভাবে দায়িত্বশীল। এই কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটি বা সামষ্টিক দায়িত্বশীলতার কারণে তাহারা এমন কথা বলিতে পারেন না, যাহা পারস্পরিক বৈপরিত্যপূর্ণ ও সাংঘর্ষিক। এই জন্য তাহাদের সর্বদা চিন্তাভাবনা করিয়াই কথা বলিতে হইবে, যাহাতে জনমনে কোনো ভুল মেসেজ না যায়। ভুল মেসেজ গেলে তাহা দেশ ও জনগণের জন্য হইতে পারে ক্ষতিকর ও অকল্যাণজনক।
শুধু রাজনীতিবিদ বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণই নহে, আমারা প্রত্যেক নাগরিকই যে যাহার অবস্থানে দায়িত্বশীল এবং আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকিতে হইবে। এই সম্পর্কে ইসলাম ধর্মে চমৎকার করিয়া বলা হইয়াছে, ‘আলা কুল্লুকুম রয়িন ওয়া কুল্লুকুম মাসউলুন আন রয়িইয়াতিহি। অর্থাৎ সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হইবে। (বুখারি) ইমাম বা নেতা যেমন জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তেমনি পুরুষ গৃহকর্তা তাহার পরিবার, নারী তাহার পরিবারের সন্তানসন্ততি ইত্যাদির ব্যাপারে দায়িত্বশীল। এবং প্রত্যেককেই পরকালে তাহার দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জবাবদিহি করিতে হইবে। ইহকালেও একটি গণতান্ত্রিক দেশে দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যাহা খুশি তাহা বলিতে বা করিতে পারেন না। আমরা যদি নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে কর্তব্যপরায়ণ হই, তাহা হইলে এমনটি হইবার কথা নহে। কবি কুসুম কুমারী দাশ তাহার ‘আদর্শ ছেলে‘ কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।’ এই কথাটিও আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন। আমরা কাজের পরিবর্তে কথাকে গুরুত্ব দিতে গিয়া অনেক সময় এই ধরনের দায়িত্বহীন বক্তব্য প্রদান করিয়া থাকি। অথচ কাজই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, কাজেই তাহার ফলাফল। নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হইলেও অন্যের দায়িত্ব লইয়া আমরা অনেক ক্ষেত্রে মন্তব্য করিতে কার্পণ্যবোধ করি না। ইহা বড়ই বেদনাদায়ক। আমাদের উচিত যাহার যাহার কাজে দায়িত্বশীল হওয়া, দায়িত্বশীল মন্তব্য করা এবং অন্যের অধিকার খর্ব না করা। দায়িত্বশীল হইবার ক্ষেত্রে মানুষকে সহযোগিতা করে বিবেক। বিবেকের তাগিদে মানুষের মধ্যে জাগ্রত হয় মূল্যবোধ। এই মূল্যবোধ সুচারু ব্যবহারের মাধ্যমেই আমাদের সর্বত্র দায়িত্বনিষ্ঠা বা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হইবে।