ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ৪০টির মতো দেশ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এর মধ্যে আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কোনো দেশ নেই। এশিয়ার মাত্র দুই থেকে তিনটি দেশ রয়েছে। ফিনল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সান্ডার স্টাব এ তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের বসবাস করা দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে এখনো যায়নি। বিশেষ করে বিশ্বের দক্ষিণের দেশগুলো ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়াকেই বেশি সমর্থন করছে। এটা সতর্ক হওয়ার জন্য বড় বার্তা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাশিয়া তার পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখায় চীন ও ভারতকে মূল অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকায় আরো অংশীদার বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এছাড়া ইউরোপিয়ান একটি থিংক ট্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, এই যুদ্ধ নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের আগের চেয়ে আরো ঐক্যবদ্ধ করেছে। তবে সমীক্ষার পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁর চীন সফর সেই ঐক্যকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নতুন বিশ্ব্যব্যবস্থায় গতি!
অর্থনীতিতে চীন ও ভারতের উত্থানের পর থেকেই নতুন বিশ্বব্যবস্থার বিষয়টি বেশি করে আলোচনায় আসে। একসময় অনেকটা পশ্চিমা নির্ভর এশিয়ার দুই দেশই এখন অনেকটাই শক্তিশালী অবস্থানে। বিশ্বমঞ্চে সেটা জানান দিতেও শুরু করেছে চীন ও ভারত। দেশ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও পশ্চিমাদের সমালোচনার ক্ষেত্রে যেন এক তারা। চীন তো সব সময়ই পশ্চিমাদের সমালোচনায় মুখর। ভারতের কাছ থেকেও সমালোচনা শুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে বিবিসির তথ্যচিত্র এবং কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে মামলাকে কেন্দ্র করে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের পর। পশ্চিমারা রাহুল গান্ধীর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছে। এরপর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর পালটা পশ্চিমাদেরও সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ভাবটা এমন যে অন্য দেশের সমালোচনা করাটা পশ্চিমা বিশ্ব ঈশ্বরের কাছ থেকেই পেয়েছে। অথচ তাদের কোনো সমালোচনা করা যায় না। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি উপেক্ষা করে ভারত রাশিয়া থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তেল আমদানি করছে।
জানুয়ারিতে ১৫টি দেশে গবেষণা পরিচালনা করে থিংকট্যাংক ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর)। এর মধ্যে আছে ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ডসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) ৯টি দেশ এবং যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও তুরস্ক। এতে যুদ্ধ, গণতন্ত্র ও ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে ভৌগোলিক কারণে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সমীক্ষার ভিত্তিতে থিংকট্যাংকটির পরিচালক মার্ক লিওনার্ড বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ পশ্চিমা বিশ্বকে আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে। তবে বিশ্বে প্রভাব হ্রাস করেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইউরোপিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক টিমোথি গার্টন অ্যাশের মতে, গবেষণার ফলাফলে যা পাওয়া গেছে, তা খুবই চিন্তার বিষয়। তিনি বলেন, পশ্চিমারা ঐক্যবদ্ধ হলেও বাকি বিশ্বের প্রভাবশালীদের আমরা বাগে আনতে পারিনি, বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতকে।
সমীক্ষায় দেখা যায়, ইইউভুক্ত ৯টি দেশে ৫৫ শতাংশ জনগণ রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করে। আগের চেয়ে আরো বেশি পশ্চিমারা এখন রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইকে গণতন্ত্র এবং নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও ব্রিটেন (৭৭ শতাংশ), যুক্তরাষ্ট্র (৭১) ও ইইউর ৯ দেশের (৬৫ শতাংশ) নাগরিক রাশিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মনে করে। ব্রিটেনের ৪০ শতাংশ এবং ইইউর ৯টি দেশের ৩৮ শতাংশ নাগরিক মনে করে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলেও ইউক্রেনকে তার সব অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে হবে। যথাক্রমে ২২ ও ৩০ শতাংশ মানুষ এখনই যুদ্ধ বন্ধ চায়, সেক্ষেত্রে রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের ভূমি ছাড়তে হলেও।
পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের দেশগুলোর ফলাফল এখন কিন্তু বিপরীত। চীনের ৭৬ শতাংশ, ভারতের ৭৭ এবং তুরস্কের ৭৩ শতাংশ নাগরিক মনে করে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া আরো বেশি শক্তিশালী হয়েছে। মস্কোকে কৌশলগত মিত্র মনে করে যথাক্রমে ৭৯, ৭৯ ও ৬৯ শতাংশ। চীনের ৪১ শতাংশ, তুরস্কের ৪৮ শতাংশ এবং ভারতের ৫৪ শতাংশ নাগরিক এখনই যুদ্ধ বন্ধ চায়, তা সে ইউক্রেনের ভূমি ছাড় দিয়ে হলেও। এই জরিপে পশ্চিমাদের ঐক্যের বিষয়টি জোর দিয়ে বলা হলেও চলতি মাসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁর চীন সফরের পর তা যেন কিছুটা হলেও পালটে গেছে। ধারণা করা হয়েছিল, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রঁ রাশিয়াকে থামাতে চীনকে ব্যবহার করবেন। কিন্তু সফরের পর তিনি যেভাবে ইউরোপকে ঐক্যবদ্ধ তথা আত্মনির্ভরশীল হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব কৌশল আমলে না নেওয়ার কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে পশ্চিমাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে। এমনকি চীন তাইওয়ানে আক্রমণ চালালেও নিরপেক্ষ থাকার কথা বলেছেন ইউরোপের শক্তিশালী দেশের এই প্রেসিডেন্ট। আবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভাও চীন সফরে গিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
—দ্য গার্ডিয়ান, ইউরো নিউজ ও ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন