ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানছেন না বিচারকরা

অধস্তন আদালতের বিচারকেরা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। সেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট থেকে কিছু নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। সেই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, বিচারিক কর্মঘণ্টার সময় ফেসবুক ব্যবহার, অন্যের কনটেন্ট শেয়ার, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে না। চার বছর আগে দেওয়া ঐ নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলছেন না বিচারক তথা বিচার বিভাগীয় অনেক কর্মকর্তা, যা দৃষ্টি এড়ায়নি সুপ্রিম কোর্টের। চার বছর আগের দেওয়া সেই নির্দেশনা এখন পুরোপুরিভাবে মেনে চলতে পুনরায় নির্দেশনা জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

গতকাল রবিবার দেওয়া সার্কুলারে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, কতিপয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের সার্কুলার অনুযায়ী নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালন করছেন না। কোনো কোনো বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা বিচারিক কর্মঘণ্টায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের চেম্বার অথবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বরত অবস্থায় তোলা ছবি বা ভিডিও আপলোড করাসহ নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ভঙ্গকারী ছবি পাবলিক পোস্ট হিসেবে আপলোড করছেন, অন্যের আপলোড করা ছবি, ভিডিও বা কন্টেট শেয়ার বা তাতে অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করছেন।

এছাড়া রাজনৈতিক ও ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে মন্তব্য বা শেয়ার করছেন এবং ইউটিউব বা অন্য কোনো মাধ্যমে নিজ বা ছদ্মনামে চ্যানেল খুলে ভিডিও আপলোড করাসহ অপ্রয়োজনীয় ও গুরুত্বহীন অনুষ্ঠানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করছেন। কতিপয় বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার এরূপ কর্মকাণ্ডের ফলে বিচার বিভাগ সম্পর্কে জনমনে নেতিবাচক ভাবমূর্তি সৃষ্টি হচ্ছে, যা অপ্রত্যাশিত।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ফেসবুকে যা পরিহার করতে হবে:

ক. জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থি কোনো প্রকার তথ্য, মন্তব্য ও অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। খ. কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমন কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। গ. রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আলোচনা সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। ঘ. কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক বা হেয় প্রতিপন্নমূলক কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। ঙ. কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করে এমন কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। চ. লিঙ্গ বৈষম্যমূলক কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রকাশ ও প্রচার। ছ. জনমনে অসন্তোষ ও অপ্রীতিকর মনোভব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো তথ্য, মন্তব্য বা অনুভূতি প্রচার ও প্রকাশ। জ. কোনো মামলাসংক্রান্তে বিরূপ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ বা প্রচার। ঝ. নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কোনো সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ বা প্রচার। ঞ. সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ছবি বা ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ ও প্রচার। ট. অপ্রাসঙ্গিক, অপ্রয়োজনীয়, মানহানিকর ও নৈতিকতা পরিপন্থি কোনো স্ট্যাটাস, পোস্ট, লিংক, ছবি ইত্যাদিতে অন্যজনকে সংযুক্ত করা (ট্যাগিং), আদান-প্রদান (শেয়ারিং), প্রকাশ ও প্রচার।

যেসব বিষয় অনুসরণ করতে হবে:

ক. প্রকাশিতব্য লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও ইত্যাদি নির্বাচন ও বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। খ. প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তের যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। গ. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক তথ্য আদান-প্রদান, প্রকাশ ও প্রচারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা এবং বিচারকসুলভ মনোভব অবলম্বন করতে হবে। ঘ. অপ্রয়োজনীয় বা গুরুত্বহীন বিষয়ে তথ্য, স্ট্যাটাস বা পোস্ট দেওয়া যাবে না। ঙ. বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য একটি পোর্টাল/গ্রুপ থাকতে পারে, যেখানে বিচারাধীন মামলার বিষয় এবং ব্যক্তিগত বিষয় ছাড়া কেবল আইনগত বিষয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনা ও তথ্য আদান-প্রদান করা যাবে। চ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও বিচারকসুলভ আচরণ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। ছ. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য আদান-প্রদান ও বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। নিজ কর্মক্ষেত্রে মামলার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা মামলা পরিচালনার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। জ. বাস্তব ও স্বাভাবিক অবস্থায় সহকর্মীদের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া সংক্রান্ত নিয়ম-নীতি, করণীয় ও বর্জনীয় দিকগুলোর প্রতিফলন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিশ্চিত করতে হবে।