দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ, বিভিন্ন স্থানে ইস্তেসকার নামাজ 

রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা কিঞ্চিৎ হ্রাস পেলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, পাবনার ঈশ্বরদী, রাজশাহী, কুষ্টিয়ার কুমারখালী, দিনাজপুর জেলায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপের তীব্রতা। এই এলাকাগুলোর মানুষ যেন জ্বলন্ত উনুনের উত্তপ্ততা অনুভব করছে। প্রখর সূর্যের তাতানো রোদ্দুর আর ভ্যাপসা গরমে জীবন ওষ্ঠাগত। প্রাণিকুল একটু পানি আর শীতলতার জন্য তড়পাচ্ছে। এছাড়া পঞ্চগড়, রংপুর, নীলফামারী, মৌলভীবাজার, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলাসমূহ এবং রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশসহ ঢাকা ও বরিশাল বিভাগসমূহের ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গরমের এই ‘গজব’ থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে উন্মুক্ত মাঠে জড়ো হয়ে বৃষ্টির জন্য ইস্তিসকার নামাজ পড়ছে মানুষ। খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, দিনাজপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরের লালপুরসহ বহু স্থানে চেখের পানি ফেলে মানুষ সালাতুল ইস্তিসকা আদায় করছে। এদিকে গতকাল মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ জেলায় হালকা বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর গতকাল জানিয়েছে, আগামীকাল শুক্রবার বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি বাড়তে পারে এবং তাপমাত্রা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বয়ে যাচ্ছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ :চুয়াডাঙ্গা ও পাবনার ঈশ্বরদীতে গতকাল বুধবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিন দুই জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই মৌসুমে চুয়াডাঙ্গায় এটিই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। আর ঈশ্বরদীতে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গত ২ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ১৫ দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় চুয়াডাঙ্গায়। গত মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল তা বেড়ে এই জেলায় মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অন্যদিকে বুধবার ঈশ্বরদীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার ঈশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়। টানা প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে দুই জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছে না কেউ। প্রচণ্ড রোদে বেশি সমস্যায় পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুরেরা। সেই সঙ্গে হাসপাতালে বাড়ছে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত আবহাওয়া কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, এই তাপপ্রবাহ আরো দুই-তিন দিন চলবে। ২২ এপ্রিলের পর অবস্থার উন্নতি হবে। গতকাল ঢাকায় তাপমাত্রা আরো কমেছে। গতকাল রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রির সামান্য বেশি। গত সোমবার ঢাকার তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তাপমাত্রা কমলেও গরম কমেনি। চার দিন আগেও বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক কম ছিল। এতে গরম প্রচণ্ড হলেও ঘাম হয়েছে কম। এখন আর্দ্রতা বাড়তে শুরু করেছে। গরমের মধ্যেও বেড়েছে বাতাসের পরিমাণ। তাতে ঘাম ঝরছে বেশি করে। চলতি এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই টানা গরম পড়ছে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে। কিন্তু কেন এই অঞ্চলে এত বেশি তাপমাত্রা? আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্কটক্রান্তি রেখা বরাবর হওয়ায় চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী অঞ্চলে এ সময় গরম বেশি থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং সমুদ্রের গরম হাওয়া। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সামাদুল হক বলেন, এক সপ্তাহ আগে থেকেই চুয়াডাঙ্গা জেলা অতি প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের আওতায় চলে যায়। অর্থাৎ, তাপমাত্রা উঠে যায় ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এই তাপপ্রবাহে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমের এই অঞ্চল কর্কটক্রান্তি রেখা বরাবর। এ কারণে প্রতি বছর গরমের সময় তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। তবে এবার তাপমাত্রা অনেক বেশি উঠেছে। কর্কটক্রান্তি হলো পৃথিবীকে ভৌগোলিকভাবে ভাগ করতে কিছু রেখা কল্পনা করা হয়। তেমনি একটি রেখা কর্কটক্রান্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কিউ এম মাহবুব বলেন, বিষুবরেখাকে শূন্য ডিগ্রি ধরা হয়। এই রেখা বরাবর অঞ্চল সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত থাকে। এই রেখা থেকে প্রায় সাড়ে ২৩ ডিগ্রি উত্তরে যে রেখাটি কল্পনা করা হয়, তা হলো কর্কটক্রান্তি। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলো কর্কটক্রান্তি রেখা বরাবর পড়েছে। এই ভূগোলবিদ বলেন, বছরে দুই বার কর্কটক্রান্তি রেখা বরাবর সূর্য লম্বালম্বিভাবে কিরণ দেয়। বিষুবরেখা থেকে সূর্য একবার সাড়ে ২৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উত্তরে আর একবার দক্ষিণে সাড়ে ২৩  ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠানামা করে। এই ৪৭ ডিগ্রি অঞ্চলকে গ্রীষ্মমণ্ডল বা উষ্ণমণ্ডল বলা হয়। কর্কটক্রান্তি রেখা যেহেতু শূন্যরেখা থেকে উত্তরে, তাই গরমের সময় এর দক্ষিণ বরাবর তাপ বেশি থাকে। বাংলাদেশে কর্কটক্রান্তি রেখার দক্ষিণ দিকে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চল। এ কারণে চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী অঞ্চলে এ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকে। এ বিষয়ে স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের একটি নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মনুষ্যসৃষ্ট কিছু কারণ যেমন—গাছপালা কেটে ফেলায় সমুদ্র থেকে কিছু দূরের এসব এলাকায় উত্তাপ বাড়ছে।