উঁচুনিচু ভুলে মূল্যবোধ তৈরি হোক ফুটবলে

দেশের (ফুটবল) কথা কে ভাবেন। তখনই দেশের ফুটবল রসাতলে যাচ্ছে, যখন আপনি ফেডারেশনের কোনো দায়িত্ব পাননি। তখনই দেশের ফুটবল গোল্লায় যাচ্ছে, যখন আপনি মঞ্চে পা রাখার জায়গা পান না। আপনি আসন পেলে সব কিছু ঠিকঠাক। না হলে হায় হায় গেল গেল, সব শেষ হয়ে গেল। ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল। যে কথাটি এদেশের মানুষ শুনে আসছে আরও ৩০ বছর আগ থেকে। তখনো বলা হতো ফুটবলের কফিনে শেষ পেরেক।

ইতিহাসের পাতায় পরিষ্কার লেখা রয়েছে, ধুলো জমে থাকা পত্রিকার পাতা খুলে পড়লেই বুঝতে বাকি থাকবে না যে, ফুটবল সমাজের মানুষগুলোই এদেশের ফুটবল ধ্বংসের নেপথ্য কারিগর। পাতানো খেলার আয়োজন, ক্লাবগুলো মিলে জেন্টেলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট করল, দেশের জার্সিতে খেলা ফুটবলারদের নিয়ে পুল প্রথা চালু করে বাফুফে খেলোয়াড়দের পায়ে শেকল বেঁধে দিল। এভাবেই গলা টিপে ফুটবলকে হত্যা করা হয়েছিল। যেদেশের মানুষের রক্তে ফুটবলের নাচন। ঘরে ঘরে ফুটবল উন্মাদনা। যেদেশে ফিফার সভাপতি জোয়াও হ্যাভালাঞ্জ এসে বলে গেলেন—যেদেশে এত ফুটবলার সেই দেশ বিশ্বকাপে না খেলে পারে না।’ ফুটবল আলোকরা সেই দেশটি কেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াল না সেটি খতিয়ে দেখার এখনো সুযোগ আছে। গত ৪০ বছরে হিসাব বলে দেবে। 

গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। তার পরও ঢুকতে হবে। টিকিট না পেয়ে দড়ি বেয়ে গ্যালারিতে ওঠার সেই ছবি এখনো পুরনো দর্শকের চোখে ভাসে। ৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল চলছে। ঢাকা স্টেডিয়ামে ঢামফা কাপ ফুটবল। রাতে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে পরদিন বিকালে দর্শক স্টেডিয়ামে এসেছিলেন ঢাকার ফুটবল দেখতে।  তখনো ফুটবল নিয়ে ভাবেননি নীতিনির্ধারকরা। তখনকার খেলোয়াড়রা সাফ ফুটবলকে এদেশের মানুষের কাছে সোনার হরিণ বানিয়ে দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দিয়ে দেশের ফুটবল দর্শককে মোহিত করে রাখা ফুটবলাররা বার বার ব্যর্থ হয়েছিলেন। লিগের পারফরম্যান্স দিয়ে দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখা চুন্নু, আসলাম, জনি, ওয়াসিম, মহসিন, মুন্না, কায়সার হামিদ, রুমিরা সাফ গেমস ফুটবলে স্বর্ণপদক এনে দিতে পারেননি। আলফাজ, জুয়েল রানা, হাসান আল মামুন, বিপ্লব, জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুরা নেপালে গিয়ে সোনার হরিণটা খপ করে ধরে ফেলেন, দশরথ স্টেডিয়ামে, ১৯৯৯ সালে।

দেশের ফুটবলের সংস্কৃতিটা এখন পালটে গেছে। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা হয় না। ব্যর্থতা নিয়ে কথা হয় না। জাতীয় দল কেন ব্যর্থ হচ্ছে তা নিয়ে কথা হয় না। জাতীয় দল ব্যবস্থাপনা কমিটিতে যারা কাজ করছেন তারা কেন সাফল্য দিতে পারছেন না। সাফল্য নেই কিন্তু বছরের পর বছর একই কমিটি দায়িত্ব পালন করছে। কেন জবাবদিহিতা নেওয়া হয় না। কথা হয় বাফুফের সভাপতিকে নিয়ে। সাবেক ফুটবলার চুন্নু মনে করেন, মাঠে পারফরম্যান্স থাকলে খারাপটা হারিয়ে যায়। মাঠে পারফরম্যান্স না থাকলে ভালোটা হারিয়ে যায়।’ বাফুফেতে ২১ জনের কমিটি। একজন খারাপ। বাকি ২০ জনই কি ভালো। দোষ হলে পুরো কমিটির হতে পারে। যার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তারা কীভাবে সমালোচনা মুক্ত থাকেন। লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যান। সমালোচকরা সেই দুর্বলতা সামনে আনতে পারলে উপকারটা ফুটবলেরই হতো। কেউ তো সমালোচনার ঊর্ধ্বে না।

ফিফা টাকা দিলেও দেশের ফুটবল উন্নয়ন নির্ভর করে সরকারি সহায়তার ওপর। সেটি বাংলাদেশ সফরে এসে ফিফার সভাপতি ইনফান্তিনিও বলে গিয়েছেন। যাকে বলেছেন তিনি শুধু শুনেছেন।  অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প গিয়ে অনুমোদন পায়নি। এটা পেলেই একডুবে সাগর পাড়ি দেবে ফুটবল, তা-ও না।

ফুটবলে টাকার সংকট রয়েছে। সাবেক ফুটবলার হাসানুজ্জামান বাবলু বলছিলেন, ফিফা হতে যে টাকা আসে সেটা দিয়ে কাজ করা যায়।’ কথা খুব একটা মন্দ না। যদি কমিটির সবাই ফুটবল উন্নয়নে একমত এবং এক নীতিতে অটল থাকতে পারতেন। স্পন্সর আনাটা নির্ভর করে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিনের ওপর। নারী ফুটবল দল যখন সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরল, তখন একজন নীতিনির্ধারক প্রস্তাব দিয়েছিলেন সাবিনাদেরকে পদ্মা সেতু ঘুরিয়ে আনতে চান। শুনে অন্য একজন কর্মকর্তা বললেন তিনি খেলোয়াড়দের জন্য বাস দেবেন। আপনি বাসের তেল কেনার ১০ হাজার টাকা দিন।’ কথাটা শুনে পিছিয়ে গেলেন। ‘বললেন, ‘কেন আমি ১০ হাজার টাকা দেব। বাফুফে দেবে।’

সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগকে দুই বছর নিষিদ্ধ করল ফিফা। আর এ নিয়ে এখন ফুটবল অঙ্গনে ঝড়। আবার সমালোচনা। অর্থ গেছে, অর্থ পাওয়া যাবে। সাফে যে বার বার গ্রুপ পর্ব হতে বিদায় নিয়েছে জাতীয় দল সেটা নিয়ে কথাও নেই। কেন সাফে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে সেটা নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনকারীদের নিয়ে কথা নেই। অথচ সামনে আরেকটি সাফ। ফুটবলেই দেখা যায়, ফুটবলার হয়ে ফুটবলকে মন্দকথায় ছিন্নভিন্ন করা হচ্ছে। ওপর দিকে থুতু ছুড়লে সেটা কোথায় গিয়ে পড়ছে। তা কি বলতে লাগে। ফুটবল রাজনীতির নামে বিভাজন বিষ ছড়ানোর বদলে বন্ধুদের ডেকে নতুন সেতুবন্ধন করা যায়। সব ভুলে ফুটবলের মিলনোৎসব হোক। যারা বাফুফেতে থাকবেন আর যারা বাইরে থাকবেন, তাদের সবার মধ্যে সৌহার্দ তৈরি হোক। নিজেদের মধ্যে সান্নিধ্য তৈরি হোক। দূরত্ব, উঁচু-নিচু ভুলে একসঙ্গে বসার মূল্যবোধ তৈরি হোক ফুটবলে। মাঠে এগারো জনের খেলায় ছন্দপতন হলে গোল হয় না। সবাই না বসলে দেশের ফুটবলও উন্নয়নের পথ পাবে না।