দশ খুন

কোল্ডস্টোরেজে জেলেদের আটকে ডুবিয়ে দেওয়া হয় ট্রলার

কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক সমুদ্র উপকূলে টেনে আনা ডুবন্ত ট্রলার থেকে অর্ধগলিত অবস্থায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ট্রলারের মাছ ও বরফ রাখার কোল্ডস্টোরেজ থেকে কয়েক জনের শরীর  জাল দিয়ে মোড়ানো, কয়েক জনের হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা, এক জনের হাত এবং আরেক জনের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উদ্ধার হয়। পেরেক দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া ছিল কোল্ডস্টোরেজের ঢাকনাও। গত রবিবার সকাল হতে বিকাল ৫টা পর্যন্ত পুলিশ ও দমকল বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহগুলো অর্ধগলিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

কিন্তু রবিবার রাত ও সোমবার সকালে মহেশখালী এবং চকরিয়া থেকে আসা লোকজন নিহতদের তাদের স্বজন বলে দাবি করেন। সেই মতে ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। নিহত সবাই মহেশখালী ও চকরিয়ার বাসিন্দা। ডুবে যাওয়া ট্রলারের মালিক মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের বাসিন্দা সামশুল আলম। তিনিও নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বলে দাবি স্বজনদের।

পুলিশের ভাষ্য, পূর্বশত্রুতার জেরে গভীর সাগরে পরিকল্পিতভাবে ১০ জেলেকে হত্যা করে ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দিতে পারে অথবা জলদস্যুরা গভীর সাগরে ট্রলারের মাছ লুট করে জেলেদের বরফ রাখার কক্ষে আটকে রেখে ট্রলারটি ডুবিয়ে দিয়েছিল। 

পিবিআই ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি সূত্রের দাবি, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন মহেশখালী উপজেলার হোয়ানক ইউনিয়নের ছনখোলা পাড়ার রফিক মিয়ার ছেলে বোট মালিক সামশুল আলম (২৩), শাপলাপুর ইউনিয়নের মিটাছড়ি গ্রামের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (১৮), জাফর আলমের ছেলে শওকত উল্লাহ (১৮), মুসা আলীর ছেলে ওসমাণ গনি (১৭), সাহাব মিয়ার ছেলে সাইফুল্লাহ (২৩), মোহাম্মদ আলীর ছেলে পারভেজ মোশাররফ (১৪), মোহাম্মদ হোসাইনের ছেলে নুরুল কবির (২৮), চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের কবির হোসাইনের ছেলে সাইফুল ইসলাম (৩৪), শাহ আলমের ছেলে মোহাম্মদ শাহজাহান (৩৫) ও চকরিয়া পৌরসভার চিরিঙ্গা এলাকার জসিম উদ্দীনের ছেলে তারেক জিয়া (২৫)।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে।  ট্রলারের বরফ রাখার কক্ষ থেকে অর্ধগলিত উদ্ধার লাশের মধ্যে তিন জনের হাত-পা রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। কয়েক জনের শরীরে প্যাঁচানো ছিল জাল। একটি লাশের গলা থেকে মাথা ছিল বিচ্ছিন্ন। আরেকটি লাশের হাত বিচ্ছিন্ন পাওয়া গেছে। লাশগুলো ট্রলারের যে কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেই কক্ষের ঢাকনাও পেরেক দিয়ে আটকে দেওয়া হয়েছিল। অক্ষত রয়েছে ট্রলারের জাল ও ইঞ্জিন। এ কারণে সন্দেহ হচ্ছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসআই আকতার কামাল জেলেদের বরাত দিয়ে জানান, গভীর সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া ট্রলারটি আরেকটি মাছ ধরার ট্রলারের জালে আটকা পড়েছিল। ঐ ট্রলারের জেলেরা রশি দিয়ে ডুবন্ত ট্রলারটি টেনে মহেশখালীর সোনাদিয়া চ্যানেলে নিয়ে আসে। রবিবার সকালের দিকে ডুবন্ত ট্রলারটি কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক (বিমানবন্দরের পশ্চিমে) চ্যানেলে পৌঁছালে পানি সেচে ফেলার পরই মৃত ব্যক্তিদের হাত-পা ভেসে উঠতে দেখা যায়। তাতে ভয় পেয়ে যান টেনে আনা ট্রলারের জেলেরা। ডুবন্ত ট্রলারটি তারা রেখে পালিয়ে যান। স্থানীয়রা লাশবোঝাই ডুবন্ত ট্রলার ভেসে আসার খবর জানালে দুপুর ২টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বেলা ৫টা পর্যন্ত ট্রলার থেকে ১০ জনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

ঘটনার পরপরই রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পিবিআই ও সিআইডির পৃথক দল। পিবিআই প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত আইজি বনজ কুমার মজুমদার ও সিআইডির ডিআইজি হাবিবুর রহমান ঘটনাটি পর্যবেক্ষক করছেন। রবিবার সন্ধ্যানাগাদ পিবিআই ও সিআইডির দল নিহত ১০ জেলের প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত করেছে দাবি করে বনজ কুমার মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, নিহত ১০ জেলের প্রাথমিক পরিচয় শনাক্ত করেছে পিবিআই। ১০ জেলের মধ্যে ছয় জন মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি, এক জনের বাড়ি একই উপজেলার কালারমারছড়া গ্রামে এবং অপর তিন জনের চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী গ্রামে। নিহত সবাই ৭ এপ্রিল একটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে সাগরে নেমেছিলেন। সেখানে জেলেদের বরফ রাখার কক্ষে আটকে রেখে ট্রলারটি ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ৭ এপ্রিল রাতে তার এলাকার বাসিন্দা সামশুল আলমের মালিকানাধীন একটি ট্রলার ১১ জন জেলে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে নেমেছিলেন। বোটে ছিলেন ট্রলার মালিক সামশুল আলম ও মাঝি মোহাম্মদ মুসাও। দুই দিন পর তিনি (ইউপি সদস্য) জানতে পারেন, ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেন ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে এলাকায় নানা কথা শোনা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, গভীর সাগরে মাছ আহরণকে কেন্দ্র করে অপর কয়েকটি ফিশিং বোটের সঙ্গে সামশুল আলমের বিরোধ বাধে। রবিবার রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে নিহত সামশুল আলমের (ট্রলারমালিক) পরিচয় শনাক্ত করেন তার স্ত্রী রোকেয়া আক্তার।

সিআইডি কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. শাহেদ মিয়া বলেন, সিআইডি প্রধান ও ডিআইজি হাবিবুর রহমান স্যারকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সোমবার সকালেও উদ্ধার হওয়া ট্রলারে গিয়েছি। আরো কিছু আলামতও সংগ্রহ করেছি। ইতিমধ্যে নিহতদের প্রাথমিক পরিচয়ও শনাক্ত হয়েছে। তবে মুখ ও শরীরের অবয়ব বিকৃত হওয়ায় কোনটি কার লাশ, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাই নিহতদের ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল আসলে বুঝা যাবে কোনটি কার লাশ। এরপরে আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি। মর্মান্তিক এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন এজেন্সি কাজ করছে। হয়তো জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনেককে আটক করা হতে পারে। তবে আটকের বিষয়টির ব্যাপারে আমার কাছে তথ্য নেই।

এদিকে, মহেশখালীতে নিহতদের পরিবার এবং স্থানীয়দের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের তথ্য মতে, চিহ্নিত জলদস্যু নুরুল কবির, নজরুল, মাহবুব এবং কালা জাহাঙ্গীর মিলে ঈদের আগে কয়েক বার সাগরে ডাকাতি করেছে। তারা সবাই চিহ্নিত জলদস্যু এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণকারী ছিলেন।

সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের দেওয়া তথ্য মতে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সাগরে ডাকাতির খবর শোনে ডাকাত দলকে ধাওয়া করতে যাওয়া ট্রলারের মধ্যে রয়েছে—মাতারবাড়ীর বাইট্টা কামাল, নুর হোসাইন বহদ্দার, আবছার মাঝি এবং মাতারবাড়ীর বাবুল মাঝির মালিকানাধীন ট্রলার।

কোনাখালীর নিখোঁজদের স্বজন আবুল হোছেন ও হারুন জানান, নিখোঁজের ঘটনা প্রচার হওয়ার পর নিহত সাইফুলের ফোনে যোগাযোগ করা হয়। অপরপ্রান্ত থেকে এক জন ফোন ধরে স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘সাইফুলের ফাতিহা দিয়ে ফেলেন এবং আপনি অন্য এক জনকে বিয়ে করে সংসার করেন।’ এরপর থেকে কয়েক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ঐ ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় চকরিয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়।