করোনা মহামারির সময় কর্মক্ষেত্রে ভিডিও কনফারেন্সের উপর নির্ভরতা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিচ্ছিন্ন কর্মীরা সেই কৃত্রিম পরিবেশে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। জার্মানির এক স্টার্টআপ কোম্পানি অভিনব প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাকে প্রায় বাস্তব করে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে।
জার্মানির দক্ষিণে কার্লসরুয়ে শহরে গিক্সেল নামের এক স্টার্টআপ কোম্পানির তিন প্রতিষ্ঠাতা অনেক অর্থ বিনিয়োগ করে বড় মাপের পরিকল্পনা করছেন। সেখানে দুটি তথাকথিত 'হলোডেক' রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা কর্মীদের মনে হবে তারা যেন একই ঘরে রয়েছেন।
কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিরো টাফানেল বলেন, 'সবুজ ও উজ্জ্বল অংশের মধ্যে ইনফ্রারেড ট্র্যাকার রয়েছে। সেটি ঘরের মধ্যে চশমা শনাক্ত করতে পারে। আমি নড়াচড়া করলে সফটওয়্যারের মাধ্যমে ছবি সংশোধন করা হয়। অন্য মানুষটিও একই জায়গায় রয়েছে বলে আমার মনে বিভ্রম সৃষ্টি হয়।'
চশমা চোখের প্রতিফলন ঘটায় বলে সেটা সম্ভব হয়। টাফানেল ভবিষ্যতে চশমা দিয়ে ভিডিও তোলার চেষ্টা চালাতে চান। তবে সেটা মোটেই সহজ নয়, কারণ সে ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল মিটিংয়ের সময় থ্রিডি এফেক্ট আর থাকবে না।
আপাতত মনে হচ্ছে, দূরের মানুষ যেন সামনে বসে আছে। কোম্পানির এক কর্মী বলেন, 'আমি মাথা তার দিকে ঘোরালে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। বলতে হচ্ছে না, হ্যালো বস আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি। মনোযোগ ও বডি ল্যাংগুয়েজ দিয়েই তা সম্ভব হচ্ছে।'
গিক্সেল কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিরো টাফানেল বলেন, 'এই অ্যাপ পরীক্ষা করতে আমরা প্রথমে গ্যারেজে এই প্রণালী সৃষ্টি করেছিলাম। কম টাকা দিয়েই সেটা সম্ভব হয়েছিল। আর এখন গোটা প্রণালী ছোট করার জন্য আমাদের হাতে অর্থ রয়েছে।'
অর্থাৎ ঘরে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে ক্যামেরা, কম্পিউটিং ক্ষমতা, ব্যাটারি ও সেন্সর যথেষ্ট ছোট আকারের হতে হবে। মোটকথা আধুনিক স্মার্টফোনের থেকেও বেশি ক্ষমতা আরও হালকা ও সবার জন্য মানানসই চশমার মধ্যে ভরে দিতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটা কীভাবে সম্ভব?
টাফানেল বলেন, 'একসঙ্গে অনেক বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হচ্ছে। একটা ডিসপ্লে রয়েছে, নানা ধরনের মানুষের কথা ভেবে ওজন, নানা পরিমাপের কথা ভাবতে হয়। ব্রাইটনেসও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ চারিপাশের আলো সত্ত্বেও স্পষ্ট দেখতে পারা চাই। আমার মতে, অগমেন্টেড রিয়ালিটি সৃষ্টি করা সবচেয়ে কঠিন। এখনো মহাকাশে রকেট পাঠাই নি বটে, কিন্তু সেটা হয়তো আরও সহজ কাজ।'
সবার চাহিদা মেটাতে কে সেই চশমা তৈরি করবে? বিশাল মাপের ডিজিটাল কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা ঢেলে ভবিষ্যতের বাজারে ভাগ বসাতে চাইছে। জার্মান ডিজিটাল শিল্প সংগঠনের সেবাস্টিয়ান ক্ল্যোস বলেন, 'মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি অনেক কাল ধরেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ম্যাজিক লিপ কয়েক বছর ধরে মূলত বাণিজ্যিক ক্ষেত্রের জন্য চশমা তৈরি করছে। অ্যাপেল কোম্পানি অগমেন্টেড রিয়ালিটি চশমা বাজারে আনবে বলে বড় আশা দানা বাঁধছে, যদিও এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এনরিয়েলের মতো কোম্পানিও বাজার ও গ্রাহকের উপযুক্ত চশমা বাজারে এনেছে।'
এমন চশমা কি কোনো এক সময়ে যোগাযোগ ও দিক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের বিকল্প হয়ে উঠবে? তাছাড়া এমন প্রযুক্তি পরিবেশ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে বদলে দেবে?
সেবাস্টিয়ান ক্ল্যোস মনে করেন, 'একই সঙ্গে আরও বেশি কন্টেন্ট দেখা যাবে, যা আশীর্বাদ ও অভিশাপও বটে। এখনই স্মার্টফোনের ডিসপ্লেতে সেটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা চাই, সবই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। যা চাই না, তাও চোখের সামনে চলে আসছে। চোখের দৃষ্টির বলয়ের মধ্যে সরাসরি উদয় হলে তার প্রভাব কিছুটা অন্যরকম হয়।'
কার্লসরুয়ে শহরের এই কোম্পানি আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রতিযোগিতা সম্পর্কে বেশ উদাসীন। তাদের মতে, এখনো পর্যন্ত এই প্রযুক্তি চোখের সামনে সীমিত ক্ষেত্র দেখাতে পারছে।
মিরো টাফানেল বলেন, 'বিষয়টা শেষমেশ প্রযুক্তিগত সমস্যা থেকে যাচ্ছে। বেশ কয়েকবার মনে হয়েছে, যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। অনেক টাকা ঢেলেও পরে বোঝা গেছে যে চোখের দৃষ্টির পরিসর রপ্ত করা যায় নি। অথচ বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে ধরতে প্রত্যেককে স্বাভাবিক দেখতে হতে হবে এবং পরিবেশের মধ্যে ডুবে যাবার অনুভূতি টের পেতে হবে। আমরা একেবারে নতুন কিছু করছি। কীভাবে, সেটা বলবো না।'
নতুন এই প্রযুক্তি কি সত্যি কাজ করছে? জার্মানির গবেষণা মন্ত্রণালয় ভরসা করে এমন 'যুগান্তকারী উদ্ভাবন' এর জন্য দুই কোটি ষাট লাখ ইউরো অনুদান দিচ্ছে। এবার এক চালু প্রোটোটাইপ তৈরি করার পালা। একটি যন্ত্র সেই লক্ষ্যে কাজে আসতে পারে।
গিক্সেল কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফেলিক্স নিনস্টেট বলেন, 'এটা একটা তথ্য সংগ্রহের ক্যামেরা ইউনিট, যা দিয়ে পরে এক অবতার সৃষ্টি করার উপাদান সংগ্রহ করা যায়। অর্থাৎ কোনো ইউজারের নকল, যা সে অন্যদের জন্য নিজেই রূপ দিতে পারে। সব কিছু একটি চশমায় ভরার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। তার জন্যই এখানে কর্মকাণ্ড চলছে। পরে সব কিছু উধাও হয়ে যাবে।'
১২ জন তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ার গিক্সেল কোম্পানির জন্য পুরোদমে কাজ করছেন। আপাতত সবাই পুরুষ হলেও প্রতিষ্ঠাতারা দ্রুত নারী সহকর্মী পাবার আশা করছেন। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চশমা প্রস্তুত হলে গোটা বিশ্ব দখল করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে।