‘জানিয়া শুনিয়া বিষ’ পান করিবার পরিণতি

নির্বাচন যত ঘনাইয়া আসিতেছে, ততই চারিদিক হইতে স্বাধীনতাবিরোধীরা নানান ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল বিছাইতেছে। এই স্বাধীনতাবিরোধীরা অত্যন্ত চৌকশ। কূটবুদ্ধি এবং অর্থশক্তিতে ইহারা অত্যন্ত বলীয়ান। কোথায়, কাহার মাধ্যমে, কীভাবে, কোন উপায়ে কত টাকায় এবং কোন কৌশলে পদ-পদবি ক্রয় করিতে হয়—তাহাদের চাইতে আর কেহ ভালো জানে না। তাহারা যাহা করে, ছক কষিয়া পরিকল্পনামাফিক করে। সুতরাং নির্বাচন লইয়া তাহাদের যেই ষড়যন্ত্র, তাহা যদি সফল না হয়, অন্তত নির্বাচনের পর দেখা যাইবে, তাহাদের বড় একটি অংশ সবচাইতে অধিক আসন আদায় করিয়া লইয়াছে। তাহাদের প্ল্যান-এ, প্ল্যান-বি কিংবা সি রহিয়াছে। একটি সফল না হইলে অন্যটি ধরিয়া তাহারা অগ্রসর হইতেছে। সুতরাং ইহা বলা অত্যুক্তি হইবে না যে, এই সকল স্বাধীনতাবিরোধীর দ্বারা স্বাধীনতার সপক্ষের দলটি ইতিমধ্যেই কোণঠাসা হইয়া গিয়াছে। তাহারাই এখন বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে তুলিতে তুলিতে ফেনা তুলিয়া ফেলে। তাহারা অত্যন্ত ভয়ংকর আগাছা। আগাছার ক্ষতিকর দিকটি একটু খেয়াল করিলে দেখা যাইবে, উহারা যাহার রস-পুষ্টির উপর ভাগ বসাইয়া ঝাড়েবংশে বাড়িয়া উঠে, শেষাবধি তাহারা সেই মূল গাছটিকেই চারিদিক দিয়া ঘিরিয়া ফেলে। নিঃশ্বাস রুদ্ধ করিয়া ফেলে। স্বাধীনতাবিরোধীরাও তাহাই করিতেছে।

মনে রাখিতে হইবে, স্বাধীনতাবিরোধীরা চিরকালই স্বাধীনতাবিরোধী। আমরা দেখিয়াছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যাহারা হিটলারের দোসর ছিল, নাৎসির পক্ষে সামান্যতম ভূমিকা রাখিয়াছিল, তাহাদের এখনো বিচারের মুখামুখি করা হয়। ২০১৮ সালে জার্মানির সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নািস তৎপরতার সহিত জড়িত ৮৯ বৎসর বয়স্ক এক বৃদ্ধাকে গ্রেফতার করিয়া বিচারের মুখামুখি করিয়াছে জার্মানি। অন্যদিকে ৯৪ বৎসরের এক বৃদ্ধ নাৎসিদের পক্ষে প্রহরী ছিল মাত্র, যুদ্ধ শেষ হইবার ৭৩ বৎসর পর এই বয়সেও জার্মানিতে বিচারের সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল তাহাকে। ইতিহাসের পাঠে আমরা দেখিতে পাই, পলাশির যুদ্ধে সবচাইতে অধিক ষড়যন্ত্র হয় ঘরের ভিতর হইতেই। নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্য পরিচালনার ভার ছিল মিরজাফর, রায়দুর্লভদের উপর। তাহারা চরম মুহূর্তে সৈন্য পরিচালনা হইতে বিরত থাকে। বীর মিরমদনের মৃত্যুর পরও মোহনলাল ও সিনফ্রে যখন ইংরেজদের কাবু করিয়া ফেলিয়াছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে মিরজাফর যুদ্ধ বন্ধ করিবার আদেশ দেন। নবাব যুদ্ধে হারিয়া যান এবং তাহাকে একপর্যায়ে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হইতে হয়। ইতিহাসের ছত্রে ছত্রে এই ধরনের ষড়যন্ত্রের কাহিনি আমরা দেখিতে পাই। বঙ্গবন্ধুও একই ভুল করিয়াছিলেন শত্রুমিত্র না চিনিয়া। এই ব্যাপারে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রথিতযশা সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলিয়াছিলেন—বঙ্গবন্ধুর সময়ে তিনি লন্ডনে ছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া দেখেন বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্য সচিব হইয়াছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড লিডার ছিলেন। আরেক বার দেখেন কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তাহার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করিয়াছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দিয়াছেন—যিনি কিনা পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম প্রবীণ একনিষ্ঠ হিতাকাঙ্ক্ষী। তিনিই এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন, আওয়ামী লীগে কত রাজাকার আছে। বিপদের সময় ইহারা ভয়ানকভাবে আসে। তাহারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম অধিক বলে।

দুঃখের এই পরিস্থিতি কবির ভাষায় ‘জানিয়া শুনিয়া বিষ’ পান করিবার মতো। যাহারা ছলে-অর্থে-কৌশলে স্বাধীনতা পক্ষশক্তির ঘরে পদ-পদবি দখল করিয়া আসন গাড়িয়াছে এবং দিনদিন তাহারা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করিয়াছে—তাহারা এখন প্রকাশ্যেই দম্ভ দেখাইতেছে। প্রশ্ন হইল, এই শক্তিশালী-প্রতাপশালী অবস্থানে তাহারা চাহিলেই কি আসিতে পারিত? না, পারিত না। প্রকৃতপক্ষে, স্বাধীনতার পক্ষশক্তির দল এই বিষ জানিয়া শুনিয়া পান করিয়াছে, ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেই বিষক্রিয়ায় তাহাদের আক্রান্ত হইতে হইবে। এই যখন অবস্থা তখন ভাবিয়া দেখিতে হইবে, বিষক্ষয় করিবার কোনো দাওয়াই স্বাধীনতাপক্ষ শক্তির নিকট রক্ষিত আছে কি না? তবে সেই সময়ও আছে কি না—তাহারও বড় প্রশ্ন।