কাপ্তাই হ্রদে নাব্যসংকট

রাঙ্গামাটি থেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ পাঁচ উপজেলায়

শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসার কারণে রাঙ্গামাটি জেলা সদরের সঙ্গে পাঁচ উপজেলা সদরের লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। উপজেলাগুলো হলো—বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি। গত মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে এসব উপজেলায় লঞ্চ যেতে পারছে না।

অনাবৃষ্টি, খরা, পলি জমে তলদেশ ভরাটসহ পানির স্তর অস্বাভাবিক হারে হ্রাস পেয়ে কাপ্তাই হ্রদ এখন প্রায় জীর্ণ-শীর্ণ এক জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য ডুবো চর জেগে উঠেছে নৌযান চলাচলের পথে। এ কারণে এই রুটে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট বোটের মাধ্যমে মানুষ উপজেলাগুলোতে যাতায়াত করছে।

অতিবর্ষণ ও ভারী বৃষ্টিপাত না হলে এই মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। যে কারণে লঞ্চ চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পানি পথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার প্রায় ২ লাখ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

ইঞ্জিনচালিত বোটচালক মো. নয়ন জানান, বেশ কয়েক মাস ধরে কাপ্তাই হ্রদে পানি স্বল্পতার কারণে তারা স্বাভাবিক গতিতে বোট চালাতে পারছেন না। অনেক জায়গায় যাত্রীদের বোট থেকে নামিয়ে দিয়ে টেনে টেনে বোট চালাতে হচ্ছে। মাঝেমধ্যে ডুবো চরে আটকে গেলে এই তীব্র গরমের মধ্যে যাত্রীদের মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মিজানুর রহমান জানান, বিলাইছড়ি নৌপথে বোট চলাচলে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন চালক এবং যাত্রীরা। বিশেষ করে বিলাইছড়ি উপজেলার কেরনছড়ি হতে ফারুয়া ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কি:মি: নৌপথে পানির স্তর এতই নিচে নেমে গেছে যে, অনেক জায়গায় ছোট ছোট বোট দিয়ে চলাচলরত যাত্রীদের বোট থেকে নামিয়ে দিয়ে টেনে টেনে বোট চালাতে হচ্ছে। সেই সময় চালক ও যাত্রীরা এক সঙ্গে বোট টেনে নিয়ে ঐ অংশটুকু পাড় হচ্ছেন। শুধু কেরনছড়ি এলাকা নয়, এই নৌপথের মধ্যে কেংড়াছড়ি, গাছকাটছড়া, বিলাইছড়ি সদরসহ অনেক জায়গায় পানির স্বল্পতায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সরকারের ৪০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির আওতায় আমরা কেরনছড়ি এলাকায় হ্রদ থেকে মাটি অপসারণ করে হ্রদের গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এই জটিল কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে।

লংগদু প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা এখলাস মিঞা খান জানান, জেলা সদর থেকে লংগদু আসতে প্রায় ৩-৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায় ইঞ্জিনচালিত বোটে। যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতি বছর এই সময়ে লংগদুসহ পাঁচ উপজেলার মানুষের ভোগান্তির সীমা থাকে না। বাঘাইছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা প্রবীণ সাংবাদিক দীলিপ কুমার দাশ বলেন, বাঘাইছড়ি, লংগদু, বিলাইছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল ও জুরাছড়ির মতো দুর্গম উপজেলার মানুষের এ সময় জেলা সদরে যাতায়াতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জরুরি কাজে এলে স্পিডবোট ভাড়া করে আসতে হয়। এত ব্যয় করা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। বর্তমানে স্পিডবোটেও মানুষ চলাচল করতে পারছে না। ছোট ছোট টেম্পো বোটে যাত্রীদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময় বেশি লাগছে। ছোটবেলায় শুনেছি কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং করা হবে। এখন বুড়া হয়ে গেলাম কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং হতে আর দেখলাম না।

রাঙ্গামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মো. মঈন উদ্দিন সেলিম মোবাইল ফোনে বলেন, প্রতি বছর এই মৌসুমে হ্রদে পানি না থাকলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসব বিষয়ে নদী রক্ষা জাতীয় কমিটি ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে অনেক বার চিঠি লিখেছি। জেলা প্রশাসকরা অনেক বার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। তারপরও কাপ্তাই হ্রদে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হচ্ছে না। সরকারকে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েও লঞ্চ চালাতে পারছি না। বর্তমানে আমার বেশ কয়েকটি লঞ্চ বসে আছে। বেকার হয়ে পড়েছেন লঞ্চের স্টাফরা।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং সংক্রান্ত ব্যাপারে ওপর মহল থেকে কোনো সুরাহা এখনো আসেনি। তবে কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং করার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত রয়েছে।