দুই বছর আগে রাজধানীর কলাবাগানের বাসা থেকে গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক সাবিরা রহমান লিপির রক্তাক্ত ও দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এখন পর্যন্ত এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই বলছে, নিহতের স্বামী এ কে এম শামসুদ্দিন আজাদকে রিমান্ডে নিয়ে একজন চিকিৎসকের উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও হত্যার কোনো সূত্র জানা যায়নি। তবে তাকে আবারও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডটি পুলিশের খাতায় ‘ক্লুলেস মার্ডার’ হিসেবে পড়ে রয়েছে।
নিহত ডা. সাবিরা রহমান লিপি গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কনসালটেন্ট (সনোলজিস্ট) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কলাবাগানের প্রথম লেনের ৫০/১ তারেস ডি ক্যাসল অ্যাপার্টমেন্টের তৃতীয়তলার ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। ২০২১ সালের ৩১ মে সকালে ফ্ল্যাট থেকে সাবিরার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার বুক থেকে পা পর্যন্ত দগ্ধ ছিল। এছাড়া তার গলায় একটি ও পিঠে দুটি আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঐ ঘটনায় সাবিরার মামাতো ভাই মো. রেজাউল হাসান মজুমদার বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
সাবিরা যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, তাতে তিনটি কক্ষ ছিল। একটিতে সাবিরা, বাকি দুটিতে দুই তরুণী থাকতেন। এর মধ্যে কানিজ সুবর্ণা মডেলিং করতেন। নূরজাহান নামের এক তরুণী সাবিরাকে পবিত্র কুরআন শরিফ পড়াতেন। ঐ বছর ঈদুল ফিতরের আগে বাড়িতে গিয়ে নূরজাহান আর ফেরেননি।
মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডা. সাবিরা রহমান দুটি বিয়ে করেছিলেন। তার প্রথম স্বামী চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ২০০৬ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। পরে সাবিরা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার দ্বিতীয় স্বামী এ কে এম শামসুদ্দিন আজাদ ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবসরে যান। তবে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে বনিবনা ছিল না তার। সাবিরার পক্ষ থেকে অভিযোগ ছিল, তাকে বিয়ে করার আগে শামসুদ্দিনের দুটি বিয়ে ছিল। একটি বিয়ের তথ্য গোপন করেছেন। এই নিয়ে সাবিরা পৃথক থাকতে শুরু করেন। তার আগের স্বামীর ঘরের ছেলেটি বিবিএতে অধ্যয়নরত। দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে ৯ বছরের মেয়েকে নিয়ে কলাবাগানের ঐ ফ্ল্যাটে থাকতেন। ঘটনার আগের রাতে মেয়েটিকে গ্রিন রোডে নানির বাসায় রেখে এসেছিলেন তিনি। রাতে বাসায় একা ছিলেন সাবিরা।
মামলা তদন্তসংশ্লিষ্ট পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, খুনি হয়তো সাবিরার ঘনিষ্ঠজন। তিনি সাবিরার সঙ্গে বাসায় ঢুকে তাকে খুন করে দরজার অটোলক করে চলে যান। যাওয়ার সময় বিছানার তোশক দিয়ে লাশ চাপা দেয় এবং তোশকে আগুন ধরিয়ে দেয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট তাকে ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাতের কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক, গৃহকর্মী, অন্য ভাড়াটে ও পাশের কক্ষের বাসিন্দাসহ তার সহকর্মী-স্বজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের পরিদর্শক জুয়েল দেওয়ান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এই হত্যার এখনো প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব হয়নি। নিহত সাবিরার ফ্ল্যাটের সাবলেট বাসিন্দা সুবর্ণাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ঐ ফ্ল্যাটে সাবিরার সঙ্গে নুরজাহান থাকতেন। তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। পরে নিহতের স্বামী এ কে এম শামসুদ্দিনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। তবে তিনি অসুস্থ দাবি করে আদালতে তথ্য উপস্থাপন করেন। আদালত একজন চিকিৎসককে উপস্থিত রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছিল।
পরিদর্শক জুয়েল দেওয়ান আরো বলেন, সাবিরার স্বামীকে সন্দেহের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সাবিরার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো ছিল না। তার ভাড়া বাসায় স্বামী কয়েক বার গিয়েছিলেন। লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের কাছে তিনি জানিয়েছিলেন যে তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। পরে সাবিরার মোবাইল ফোনের কললিস্ট থেকে জানা গেছে যে কাউকে না জানিয়েই সামসুদ্দিন সাবিরার বাসায় যেতেন। সামছুদ্দিন ঘটনার আগের রাত ১০টা ৩৮ মিনিট থেকে টানা ২৬ মিনিট ১০ সেকেন্ড মেসেঞ্জারে কথা বলেছিলেন সাবিরার সঙ্গে। পর দিন সকালে সামছুদ্দিনের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। পিবিআইয়ের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, সামছুদ্দিনের বাসায় তার গাড়িচালক সাইফুল ইসলাম কখনো থাকতেন না। হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে তার বাসায় সাইফুল ছিলেন। এটাও রহস্যজনক।