কোকিলের কুহুধ্বনি যেন বিপদেরই প্রতিধ্বনি

মানুষের চোখের উপর একটি পর্দা রহিয়াছে। সভ্যভব্য মানুষ লজ্জার কিছু দেখিলে চোখের পর্দা নিচে নামাইয়া ফালায়; কিন্তু যখন মানুষ লজ্জা হারাইয়া ফালায়, তখন আর চোখের পর্দা কাজ করে না। নির্লজ্জের মতো সে তখন এমন সকল কর্ম করে, যাহা দেখিয়া অন্যরা বরং লজ্জা পায়। আমরা দেখিতেছি, যাহারা এই দেশের স্বাধীনতার বিরোধী ছিল, সেই রাজাকার-আলবদর-আলশামসরা গত ৫০ বৎসরে সকল দলে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। যখন যেই দল ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের প্রভাব-বলয়ে ঢুকিয়া তাহারা ক্ষমতার ধারক-বাহক হইয়া উঠে। অতঃপর তাহারা যত ধরনের অপকর্ম করা সম্ভব সকল কিছু করিয়া থাকে। এইভাবে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। ফলে এইভাবে একসময় এমন অবস্থার সৃষ্টি হইতে পারে—যাহাতে পরিবর্তন অনিবার্য হইয়া উঠিতে পারে। আরেকটি দিক হইল—দলমত-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে প্রশাসন রাষ্ট্রের জনগণের জন্য কাজ করিবে। ইহার জন্যই প্রশাসনের সৃষ্টি। কাহারা ক্ষমতায় রহিয়াছে, কাহারা নাই—ইহা তাহাদের বিবেচ্য হইতে পারে না। তাহাদের বিবেচ্য থাকিবে নিয়মকানুন; কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হইল—তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে সকল আমলেই প্রশাসনের তাৎপর্যপূর্ণ একটি অংশকে পক্ষপাতদুষ্ট হইতে দেখা যায়। একটি সুন্দর, বসবাস উপযুক্ত এবং কল্যাণকর দেশ গঠনের লক্ষ্যে আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়াছি। সচেতন মানুষ মাত্রই বরাবর খেয়াল করিয়াছেন যে, যখন যাহারা ক্ষমতায় আসিয়াছে, তাহারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের মতো করিয়াই সাজাইয়া থাকে। 

আমরা দেখিতে পাই, এই বিশ্বে বাড়াবাড়ির কোনো স্থান নাই। অপূর্ব সুশৃঙ্খলা বজায় রহিয়াছে মহাবিশ্বে। মহান সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক-বিবেচনা, আত্মমর্যাদাবোধ দিয়া। আর তাহার পর সতর্ক করিয়াছেন বাড়াবাড়ি না করিতে; কিন্তু যাহারা বাড়াবাড়ি করেন, তাহারা ভুলিয়া যান, প্রকৃতি চিরকাল একই রকম থাকে না। বিজ্ঞান বলে, কোনো স্থানে বাতাস খুবই গরম হইয়া গেলে উহাকে ঠান্ডা করিতে ঝড় সৃষ্টি হইবেই। একইভাবে প্রতিনিয়ত বিশ্রী আর ভ্যাপসা গরমের দাপট মিলাইতে সাগরের বুকে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়। আর অধিক বাড়াবাড়ি হইলে সেই নিম্নচাপ হইতে ভয়ানক ঝড় আসিয়া লণ্ডভণ্ড করিয়া দেয় সকল কিছু। অর্থাৎ প্রকৃতিতে অধিক উত্তাপ দীর্ঘকাল বজায় থাকিলে উহার ভারসাম্য আনিতে বড় ঝড় সৃষ্টি হইতেই হয়। বিশ্বব্যাপী সমাজ-রাষ্ট্রেও আমরা প্রকৃতির এই অবস্থার প্রতিফলন দেখিতে পাই। সুতরাং যাহারা যথার্থ জ্ঞানীগুণী, তাহারা নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি করেন না। অন্যদিকে যাহারা অপরিণামদর্শী, তাহারাই কেবল সীমা লঙ্ঘনের বিপদ অনুধাবন করিতে ব্যর্থ হন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে?’ কবিতার পঙিক্তর মতো এই পৃথিবীতে কেহ চিরকাল ক্ষমতা ধরিয়া রাখিতে পারে না। হয়তো কেহ ১০, ২০, ৩০ বা ৪০ বৎসর ক্ষমতার আসমানে অবস্থান করিতে পারে—ইহা একেক দেশে একেক রকম—কিন্তু শেষ ফলাফল হইল ক্ষমতার আসমান হইতে তাহাকে একদিন জমিনে নামিয়া আসিতেই হইবে। এবং আরো একধাপ বাড়াইয়া বলা যায়—সকলকেই অন্ধকার মাটির ঘরে পাকাপাকি প্রবেশ করিতে হইবে। ইহা নেতিবাচক কোনো কথা নহে। আপত্তিকর কথাও নহে। ইহা হইল জগতের চিরন্তন বাস্তব কথা। আর এই বাস্তবতা ভুলিয়া কেহ যদি মনে করেন, মধ্যগগনের সূর্য কখনোই অস্ত যাইবে না, গোধূলিবেলা, সন্ধ্যাকাল এবং অমানিশাও আসিবে না কখনো—তাহারা নিঃসন্দেহে বোকার স্বর্গে বসবাস করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ক্ষমতাধরদের পতনের নেপথ্যে থাকে তাহাদের স্বীয় নীতি-আদর্শের বিচ্যুতি। যখন ভেজাল প্রবেশ করে, যখন আদর্শহীন নীতিবর্জিত লোকের আনাগোনা বাড়িয়া যায় কোনো বড় শক্তির মধ্যে, তখন তাহা ঘটে সেই শক্তির ক্ষয়ের জন্যই। সুবিধাভোগী বসন্তের কোকিল ততদিন অবধি কুহুকুহু করে, যতদিন বসন্ত থাকে। বসন্তের সময় কোকিলদের মিষ্ট কুহুধ্বনি হৃদয়ে ভালোলাগার অনুভূতি জাগাইলেও তাহাই আসল চিত্র নহে। সেই কুহুধ্বনি বরং ভবিষ্যৎ বিপদের ঘণ্টাধ্বনিতুল্য।