কত না-বলা কথা বাকি রয়ে গেল

অনন্তকালের কাছে কয়েক হাজার বছর যেমন নিতান্ত পথিক, মহাকালের কাছে তেমনি তুচ্ছ পথিক কয়েক শ বছর। আবার আমাদের মগজেও রয়েছে লক্ষকোটি নিউরনের স্মৃতিপথ। সেই স্মৃতিপথের আছে সেনসরি মেমোরি, শর্ট টার্ম ও লং টার্ম মেমোরি, হ্যাপটিক মেমোরি, এক্সপ্লিসিট-ইমপ্লিসিট মেমোরি, একোয়িক আইকনিক মেমোরি। টুকটুকে লাল মেঝের সিঁড়ি, উঁচু সিলিংয়ের বিশাল সব জানালার অনেকগুলো ঘরের যৌথ পরিবার, শ্বেতপাথরের টেবিল, আয়না বসানো আলমারি উঁচু পালঙ্ক, শ্যাওলা ধরা ছাদ, বাড়ির সামনে বিশাল উঠানে বাগান, টেবিলে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি চা—এরকম একটি অন্দরমহলের ছবির সঙ্গে সম্ভ্রান্ত সাবেকি রেকর্ড প্লেয়ার তৈরি করে সেই একোয়িক মেমোরি। একোয়িক মেমোরি হচ্ছে সেই স্মৃতিপথ, যা একবার কানে শুনলে বা চোখে দেখলে সারা জীবন মাথায় থেকে যায়। পথের আছে নানান বাঁক। আমাদের প্রিয় এক কবি লিখেছিলেন—‘পথের মাঝে পথ হারালে আর কি পাওয়া যায়’। সংস্কৃতির ধ্রুপদী পথগুলো কি আমরা হারিয়ে ফেলছি?

পথ সম্পর্কে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কথাটি বলেছেন বোধ হয় রামমোহন রায়। পথের যে বিন্দুতে দাঁড়ালে হেঁটে আসার পথ আর হেঁটে যাওয়ার পথ দুটোই নজরে আসে, কোন অংশকেই অস্বীকারের উপায় থাকে না, সেটাই ধ্রুপদী পথ। বলা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সামাজিক আচার মূল্যবোধ হয়ে উঠতে পারে না, যতক্ষণ তাতে ধ্রুবত্ব আরোপ না হয়। যারা লং প্লেয়িং রেকর্ডে ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র, সুপ্রভা সরকার, পূরবী দত্ত কিংবা মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরোজা বেগমের নজরুলসংগীত শুনেছেন; তারা জানবেন নজরুলসংগীতের প্রকৃত সুর। রেকর্ডে খেয়ালের বন্দিশের যে গাম্ভীর্য, এমপি-থ্রির রেজুলেশনে সেই স্বর কই? রেকর্ডে এই গান শোনার অভিজ্ঞতা সেই একোয়িক মেমোরির মতো, যা একবার শুনলে চিরদিনের জন্য মাথায় গেঁথে যায়। তুলনায় এমপি-থ্রিতে গান শোনা অনেকটা সেনসরি মেমোরির মতো, মেডিক্যাল টার্মের ভাষায় যা কয়েক সেকেন্ড মাত্র স্থায়ী হয়। কোনো গান শুনলাম, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তা ভুলেও গেলাম। তাৎক্ষনিক অ্যাপিল মেটাতেই যেন এসব গানের আসা। এমপি-ফোরে সাপুড়ে নৃত্য, জেলে নৃত্য, কৃষান-কৃষানিদের নাচ-গানের নামে যা দেখানো হয়, সত্যিই বাঙালি কখনো এমন নাচ নেচেছিল কি না, এমন গান গেয়েছিল কি না তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। লালনের গান এখন প্রযুক্তির শাসনে শাসনে বিকৃত বস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। গৃহস্থ ঘরের উঠোনে বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীরা যে কীর্তন গাইতেন, এখনকার এমপি-ফোরে দেখা গানের সঙ্গে তার কোনো মিলই নেই। এই যন্ত্র যে কী পরিমাণ স্নায়ু পীড়াদায়ক হয়ে উঠতে পারে, তা এই মাধ্যমে গান না শুনলে বোঝা যেত না। বাংলা গানের একটা বিশাল ঐতিহ্যের প্রবহমান ধারার উত্সমুখ বেশ গভীরে প্রোথিত, যা তীব্রভাবে স্বতন্ত্র, দেশজ, বাংলার মাটির স্বকীয়তায় ঋদ্ধ। এর শেকড় খুঁজলে আমাদের যেতে হবে অষ্টম-নবম শতাব্দীর চর্যাপদ পর্যন্ত। সংগীত ব্যাপারটা জীবন্ত বলেই তা শোনার মাধ্যমে পরিবর্তন আসতেই থাকবে। কিবোর্ড মিড়ের কাজ ঠিকঠাক দিতে না পারায় সময়ের দাবি মেটাতে যেমন ফাইভ-ডি টেকনোলজির সি-বোর্ড এসেছে, মিউজিক কম্পোজাররা তা সানন্দেই মেনে নিয়েছেন। সময়ের হাওয়া মানতেই হবে, কিন্তু শ্রোতার আগ্রাসী চাওয়ার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করলে ধ্রুপদত্বের সর্বাঙ্গীণ সর্বনাশ ঘটে। সংগীত নিয়ে কথা বলার অধিকার শ্রোতারই সবচেয়ে বেশি, সেই দাবিতে কথাগুলো বলছি।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে ঢাকার রাস্তায় যখন হাইড্রোলিক হর্নের অত্যাচার ছিল না, যখন পাশের বাড়ি থেকে গ্রামোফোন বাজলে তার গীতিময় সুর ভেসে আসত, যখন শাস্ত্রীয় সংগীতের স্বতন্ত্র সম্মান ছিল, উচ্চাঙ্গসংগীতের আসরে ভিড় জমাতেন সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকেরা, যখন এইচএমভি অকুণ্ঠ দ্বিধাহীন হয়ে সবাইকে পরামর্শ দিত, গায়নশৈলীকে কীভাবে উন্নত করা যায় সেদিকে মনযোগ দিতে, যখন সংগীতাঙ্গনে পারফরমার নয়, ছিলেন সংগীত সাধকেরা—তখনই আমরা বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগ পার করে এসেছি। বার্নাড শ বলতেন, আধুনিকদের দাবি যে তারা প্রাচীনদের চেয়ে বেশি জানে, বেশি দেখছে, সেজন্যই এগিয়ে আছে। এটা তারা বলে, কারণ খেয়ালই রাখে না যে, তারা যা জানে তা ঐ অতীতই, যা দেখে তা ঐ প্রাচীনদের ঘাড়ে ভর করেই। দাদা-নানা গাছ পুঁতলেই নাতি ফল পেড়ে খেতে পারে।

দুই.

খেতে কাজ করার সময় আমাদের পূর্বপুরুষেরা আব্দুল আলীমের গাওয়া ‘চিরদিন পুষলাম এক অচিন পাখি’ গাইতে গাইতেই ধান-পাটের বীজ বুনেছেন। এই দেশে তন্ত্র নাথ সহজিয়া এবং আরো নানান সংগীত সাধনার ধারা এসে মিশেছে। আমাদের খুঁজে নিতে হবে গোটা জাতির মুক্তির উপযোগী সাংস্কৃতিক ধারা। সেটা কোনো একক ধারা হতে পারে না। ভিক্ষাপোজীবী, আল্লাহর জিকির, নবিতত্ত্ব, গৌরগান, গোষ্ঠগান, কীর্তন, আউলচাঁদ, ফকির, বয়াতি, দরবেশ, বৈষ্ণব—সবই আমাদের সংগীতের ভান্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। সংস্কৃতি বিচিত্র ও বহুমুখী হতে বাধ্য। অথচ গণমাধ্যমে এই মেলবন্ধনের তেমন প্রতিফলন নেই। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, মারফতি, জারিসারি, আলকাপ, গম্ভীরাসহ নানান ঘরানার সংস্কৃতির সংগীত গণমাধ্যমের কাছে এখনো লোকসংগীতই এবং একই সঙ্গে তা যত ধরনের ফিউশনে গাওয়া হচ্ছে, তা ঠিক আমাদের আদি ঘরানার নয়। সংগীত ব্যাপারটা জীবন্ত বলে তাতে পরিবর্তন আসতেই থাকবে কিন্তু আদি শেকড়কে একেবারে বিকৃত করে নয়।

গণমাধ্যম ও জনসংস্কৃতি—কে কাকে প্রভাবিত করে? রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, আমার কবিতা গেলেও বিচিত্র পথে, হয় নাই সর্বত্রগামী। যে কৃষক মাঠে পেঁয়াজ-রসুন বুনছে রবীন্দ্র নজরুল কিংবা পঞ্চকবির গান পৌঁছেনি তার কাছে। সংস্কৃতির একক কোনো ধারা থাকে না যা দিয়ে কোন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বোঝা যায়। চিনুয়া আচিবের উপন্যাসে নাইজেরিয়ার সংস্কৃতি কী জীবন্ত! তার পরও চিনুয়ার উপন্যাসে কতটুকু বোঝা যায় নাইজেরিয়া কিংবা আফ্রিকাকে? রবীন্দ্র, নজরুল, জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দিন, শাহ আব্দুল করিমের শক্তপোক্ত অবস্থানের পরও নগর তরুণের সংগীত বিনোদনের জন্য প্রয়োজন পড়ছে রিমিক্সের। রিমিক্সের ভালোমন্দ দুই দিকই আছে। ঐতিহ্যসূত্রে যে সোনার টুকরো তারা পেয়েছে, তাকে আঁকড়ে থাকা, ছড়িয়ে দেওয়াটা ভালো দিক। আবার এই পরিস্থিতি প্রজন্মের মেধাবৃত্তিক সৃজনশীল নির্মাণের সংকটকে প্রমাণও করে একই সঙ্গে।

বাংলাদেশে জেলাভেদে নববর্ষ উদ্যাপনের ধরন কত বিচিত্র! উত্তর বাংলার যে মানুষটি গরুর গাড়ি চালিয়ে পাড়ি দেন মাঠ-প্রান্তর, শরীরের শক্তির চেয়েও ভাওয়াইয়ার শক্তি তার কাছে বড়। ছাদ পেটানো বা কোনো ভারী জিনিস তোলা কিংবা ধান ভানার সময় যেসব গান গাওয়া হয়, তার প্রতিটিই স্বতন্ত্র্য ধারা। ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ প্রবাদ তৈরির নেপথ্য কারণ লক্ষ করুন। ধান ভানতে গেলে ধান ভানার গানই গাইতে হবে, শিবের কীর্তন নয়। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সাধনাই কি মানুষ হয়ে ওঠার সাধনা নয়? মনে পড়ে গত শতকের আশির দশকে বিটিভিতে প্রচারিত মুস্তাফা জামান আব্বাসীর ‘ভরা নদীর বাঁকে’ অনুষ্ঠানটির কথা। প্রান্তিক প্রতিভাবানেরা একটু সুযোগ পেলে কীভাবে সংগীতজগতের সম্পদ হয়ে উঠতে পারেন, তা দেখেছি তখন। বিটিভিতে গাওয়ার আগে মহকুমা শহরের দু-একটা কবিয়ালি আসর ছাড়া বড় পরিসরের সংগীত মঞ্চে ডাকা হতো না যাদের, বিটিভিতে গাওয়ার পরে তারা পরিচিত হন মূলধারার শিল্পী হিসেবে।

এখনকার বাংলা গানের বাণীর দারিদ্র্য, সুরে মৌলিকত্বের ঘাটতি, তুচ্ছ আধুনিকতার ব্যবহার আমাদের সমৃদ্ধ বাংলা গানকে বুড়ো আঙুল দেখানোরই শামিল। গানের জগতে যে নৈরাজ্য ঘটছে, তা ঘটা উচিত কি না, গান শোনার মাধ্যমকে আরো বহুমাত্রিক করা যায় কি না, আমাদের অঞ্চলভিত্তিক গানের যে সুরবৈচিত্র্য, তাকে স্থান-কাল নিরপেক্ষ করা যা কি না (লোকোগানের তকমা থেকে মুক্তি দিয়ে)—এমন অনেক প্রশ্নই আলোচনার বাইরে থেকে গেল। সেই আলোচনার দাবি রইল তার, তাদের কাছে সংগীত নিয়ে আলোচনার গভীরে প্রবেশের সক্ষমতা আগ্রহ কৌতূহল যার আছে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক