চুমু :সর্বরোগের মহৌষধ!

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

হিরুর সময়টা ইদানীং একদমই ভালো যাচ্ছে না। ব্রিটেনে এসে খোদ নিজ কমিউনিটির মানুষের কাছেই ‘ব্রিটিশ’ উপাধি পেতে চলেছে। এর ওপরে পড়েছে চুমু কেলেঙ্কারিতে!

ঘটনার সূত্রপাত সেদিন ইংল্যান্ডের খেলার দিনে। আফগানিস্তানের রশিদ খানসহ অন্যান্য বোলারদের সেদিন বেধড়ক পিটুনি দিচ্ছিল মরগান-মঈন আলীরা। তা দেখে ইংরেজ সমর্থকদের মনে খুশির বান ডেকেছিল ঠিকই, কিন্তু মনে হতাশাও কাজ করছিল। একে একে তো বেলা কম গড়ালো না। সেই কবে থেকে ওয়ানডেতে ফাইট দিয়ে যাচ্ছে তারা, বেশ ক’বার ফাইনালও খেলল, অথচ আরাধ্য কাপটির গায়ে একটিবারের জন্যও চুমুু আঁকার সৌভাগ্য হলো না।

কথাটা এক ইংরেজ হিরুকে বলার পরে হিরু সহাস্যে বলল, ‘বিশ্বকাপ শুরুর আগে তো প্রতিটি দেশেই ট্রফিটা ঘুরিয়ে আনে।’

‘তা আনে বটে। তো?’

‘যেহেতু এবার বিশ্বকাপটা ইংল্যান্ডেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে, ট্রফিটা এখানেই বহুদিন ধরে রাখা আছে, তাই না?’

‘তা আছে বটে। তো?’

‘তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এক ফাঁকে চুমুর ব্যাপারটা সেরে ফেললেই তো হতো!’

হিরুর সমাধান শুনে ব্রিটিশ ভদ্রলোকটির মুখে রা নেই।

 

সেদিন হিরু ভুলক্রমে ইংরেজদের গ্যালারিতে ঢুকে পড়েছিল। বাঙালি কমিউনিটিতে তার ব্রিটিশ হওয়ার বদনাম ছড়িয়ে পড়ার পরে হিরু আর ভুল করতে চায়নি। ইংল্যান্ডের জার্সি তো সেদিনই পরিহার করেছে। এমনকি ইংল্যান্ডের সমর্থনও। কিন্তু ‘কপালের নাম গোপল’ হলে যা হয় আর কী! বাংলাদেশের জার্সি গায়ে হাতে ‘টাইগার’ নিয়ে একজন (হিরু) ইংল্যান্ডকে সমর্থন দিতে এসেছে—ইংল্যান্ডের সমর্থকদের জন্য নির্ধারিত গ্যালারিতে এমন বার্তাই ছড়িয়ে পড়ল। হিরুর বেশ খাতির-যত্ন জুটল। একসময় টেলিভিশনের বিগস্ক্রিনেও দেখাল ওকে। মুহূর্তেই কলজেটা আঁতকে উঠল, ‘খাইছে! ‘ব্রিটিশ’ তকমা স্থায়ী হতে আর বুঝি বাকি রইল না...।’

এত কিছুর মধ্যেও গ্যালারির এক ব্রিটিশ রমণীর মন পেল না হিরু। বালিকা সর্বক্ষণ মুখ বাঁকা করেই রইল। সবাই যখন হিরুকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছিল (আমাদের দেশে যেটা ‘তেল’ বলে গণ্য হতো!), তখন এক তরুণী মুখ বাঁকিয়ে বলল, ‘এই বাংলাদেশের কারণেই আমরা গতবার কাপ নিতে পারিনি!’

‘কেন, তোমরা কি গতবার বাংলাদেশের কাছে ফাইনালে হেরেছিলে?’

হিরুর খোঁচা তরুণী আমলে নিল না। বলল, ‘তার আগেরবারও তোমরা আমাদের ডিস্টার্ব করেছ।’

‘এবার তো প্রতিশোধ নিয়ে নিলে। হারিয়ে দিলে আমাদের। ব্যস, সমান সমান।’ হিরু সমঝোতায় আসতে চাইল।

‘না। তোমাদের আমরা এবার সেমি-ফাইনালে হারিয়ে, তবেই ফাইনালে যেতে চাই।’

হিরু থ হয়ে রইল। একজন বাঙালি হয়ে সে যতটা না বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে চাইছে, এই তরুণী তার থেকেও বেশি প্রত্যাশা করছে। প্রবল প্রতিহিংসা নিয়ে বসে আছে সে!

‘এর থেকে সাবধান হিরু।’ সে নিজেকে বোঝাল।

খেলায় মনোযোগ দিল। এডউইন মরগান আর রশিদ খানকে যেন ছক্কার নেশায় পেয়েছে। ছক্কা খেতে খেতে রশিদ খান বোলিংয়ে শতক পূরণ করে ফেলল। মরগান তো ছক্কার বিশ্ব রেকর্ড করে, শুধু ছক্কার মেরেই শত রান করে বসল। হিরু হাসিমুখেই সেঞ্চুরিয়ানকে হাততালি দিয়ে শুভেচ্ছা জানাল। তখন হঠাত্ টের পেল—ওর গালে কারো নরম ঠোঁটের স্পর্শ। সেই প্রতিশোধপরায়ণ বালিকা ‘খুশিতে, ঠ্যালায়, ঘোরতে’ হিমুকে চুমু খেয়ে বসেছে!

‘এখন কী করণীয়?’ হিরু অনেকক্ষণ ভাবল। ‘বালিকার বিরুদ্ধে কি মামলা ঠুকে দেব?’ নিজেকে শোধাল ও। ‘তাতে হয়তো কিছু ব্রিটিশ পাউন্ড মিলবে! কিন্তু যে ‘সম্মান’ গেছে, তা কি আর ফিরে আসবে!’

লজ্জায় হিরুর মাথা কাটার দশা হলো! এমনিতেই নিজ কমিউনিটিতে সে পিওর বাঙালি হয়েও ‘ব্রিটিশ’ বনে গেছে! এখন আবার ব্রিটিশ রমণীকে চুমু খেয়েছে! ছিঃ ছিঃ রব উঠতে আর বাকি নেই! তাছাড়া, তাকে কেউ চুমু খেয়েছে জানলে কোন বালিকা তাকে বিয়ে করবে?

অনেকটা গোপনে সেদিন স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে এসেছিল হিরু। চোরের মন যেমন সর্বদা পুলিশ পুলিশ করে, তেমনই হিরুর মনে বারবার এই আতঙ্ক চেপে বসল, বোধহয় তার ওই চুমু কেলেঙ্কারি ফাঁস হতে দেরি নেই!

 

দুই

বন্ধু লিপটনের কল পেয়ে হিরুর আতঙ্ক তালগাছে চড়ল যেন! কিপটেমিতে লিপটনের জুড়ি মেলা ভার। তার সম্পর্কে কথিত আছে, মিসডকল দিয়ে ব্যালেন্স চেক করে সে। সে কারণে এলাকায় তার নাম হয়ে গেছে—কিপটুস লিপটুস! সেই লিপটন কিনা তাকে আইএসডি কল দিয়েছে!

কল ধরে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে লিপটনের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর কানে এলো, ‘চুমুতে আজকাল কত কী-ই না হয়!’

একেই বুঝি বলে যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত্রি হয়! হিরুর কলিজা শুকিয়ে পানি। লজ্জায় চুপ করে রইল ও।

ওপাশ থেকে লিপটন বলে চলল, ‘বুঝলি, আজকাল ডাক্তাররা চুমু থেরাপি শুরু করেছে। সেদিন এক তরুণী গিয়েছে ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার তার ব্রণের সমস্যা ঠিক করার জন্য তরুণীর গালে চুমু খেয়েছে! ভেবে দেখ—চুমুতে ব্রণ দূর! আচ্ছা, ওই ডাক্তার যদি কারোর টাক মাথায় চুমু খায়, তাহলে কি তার টাক ঘুচে যাবে?’

এতক্ষণে হিরু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এবারে ওর পার্ট নেওয়ার পালা। লিপটনকে ধমকের সুরে বলল, ‘তোর কি এতই চুলকায়?’

সঙ্গে সঙ্গে লিপটন সোল্লাসে বলল, ‘এই ভালো বলেছিস রে! আমার তো চর্মরোগ আছে। চুমুতে যদি ব্রণ দূর হয় তাহলে তো চুলকানিও সেরে যাবার কথা, নাকি?’

হিরু ফোনের এপাশে মুচকি হেসে বলল, ‘যা ওই ডাক্তারের কাছে। চুমু হলো গিয়ে সর্বরোগের মহৌষধ। আর তোর এইসব সামান্য চর্মরোগই তো! পাইলসের সমস্যা থাকলেও তাকে গিয়ে বলতে পারিস!’

লিপটন এবারে সিরিয়াস হলো। ‘মজা কম নে। ঘটনা কিন্তু সত্য!’

হিরুও বন্ধুবরের কথার সুর ধরেই বলল, ‘সবকিছু সত্য ঘটনা থেকেই নেওয়া হয় রে পাগলা। দেখিস না—সিনেমায় কী হয়? নায়িকাকে সাপে দংশন করলে নায়ক চুমু দিয়েই সেই বিষ তুলে ফেলে! বিষে বিষক্ষয় নয়, বাস্তবিক অর্থে ঘটনা হলো—চুমুতে বিষক্ষয়!’

 

তিন.

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে খেলার দিনে বাংলাদেশ ৩২২ রানের টার্গেট পেয়েছে দেখে হিরু বেশ খুশিই হলো। কিন্তু ওই যে, কপাল মন্দ হলে যা হয় আর কী! খেলা শেষে স্টেডিয়ামে বসেই সকলে বলাবলি করতে লাগল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান কম হয়ে গেছে। আর কিছু রান করলে লিটন দাসের সেঞ্চুরিটাও হয়ে যেত! অভিযোগ উঠল, লিটন দাস সেঞ্চুরি করুক, এটা নাকি হিরু চায়নি। সে কারণেই সে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই ‘কম রান’ টার্গেট পেয়ে খুশি হয়েছে!

অভিমানে সেদিন হিরু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বসল, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিছু রান কম করে ফেলেছে। লিটন দাসের সেঞ্চুরিটা মিস হয়ে গেল!’

বাংলাদেশের পরের ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়া ৩৮১ রান তুলল। এবার অন্যরা হিরুকে গালমন্দ করতে লাগল, হিরু সেদিন বেশি রান চেয়েছে বলেই না অজিরা আজ এত রান তুলল। নাহলে বাংলাদেশ নির্ঘাত এ ম্যাচ জিতত!

‘ক্যান, অজিরা এত্ত রান করতে পেরেছে বলেই তো মুশফিকুর রহিম সেঞ্চুরি করতে পেরেছে!’ হিরুর এই পাল্টা যুক্তিকে কেউ কানেই তুলল না!

‘ভারী বিপদ তো! ছি হিরু ছি!’ হিরু নিজেকে মৃদু ভর্ত্সনা দিল। ‘এই দেশে আর থাকা যাবে না। এখানে থাকতে থাকতে বাঙালিগুলো ব্রিটিশ বনে গেছে! এখন আমাকে ব্রিটিশ তকমা দিতে উঠেপড়ে লেগেছে!’

ম্যাচ শেষে বের হওয়ার সময় একজন বলল, ‘আমাদের ব্যাটসম্যানরা এখন বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি করা শিখে গেছে। কিন্তু আরেকটা জিনিস ভুলে গেছে তারা!’

‘কী সেটা?’ হিরু কৌতূহলবশতই জানতে চাইল।

‘আরে, গতবার দেখলেন না মাহমুদুল্লাহ সেঞ্চুরি করে তার প্রেয়সীকে কী সুন্দর উড়ন্ত চুমু খেয়েছিলেন! আর এবার...’ কিছুটা নয় যেন সমুদ্র সমান আফসোস ঝড়ে পড়ল তার কণ্ঠে।

হিরুর হঠাত্ নিজের সেই চুমু কাহিনি মনে পড়ে গেল। দ্রুতপদে অন্যদেরকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে এলো ও।

 

চার.

বিমান লন্ডন থেকে ঢাকায় আসার পথে দুবাইতে ‘বিশ্রাম’ নিচ্ছিল।

হিরু দেশে ফিরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বাকি খেলাগুলো না দেখেই।

‘এভাবে আসরের মাঝখানে কেউ নিজ দলের প্রতি সমর্থন রেখে ভাগে!’ হিরুর প্রতি তীব্র অভিযোগ উঠল।

‘একমাত্র ব্রিটিশ হলেই কেউ এমনটা করতে পারে!’ কেউ কেউ এমনটাও বলল।

হিরু ওসব গায়ে মাখল না। ইংল্যান্ডে থাকলে তাকে চুমু কাহিনি তাড়া করে বেড়াবে। অনেকদিনই ও সেই বালিকাকে দেখেছে ওর আশপাশে ঘুরঘুর করতে! কল্পনা না বাস্তব—তা নিশ্চিত করে বলতে পারবে না অবশ্য। সে জন্যই তড়িঘড়ি করে পালিয়ে বাঁচা।

দুবাইতে একটা মজার ঘটনা দেখল ও—এক তরুণ সিগারেট খেয়ে তার পাশে বসা তরুণীকে চুমু খেল। তরুণী আবার তরুণের কাঁধে মাথা রেখে আয়েশী মুডে সেই ধোঁয়া নিঃসরণ করল! ‘এটাই কি এদের প্রেম?’ মনে মনে হাসল ও। ‘তবে আইডিয়াটা মন্দ নয়। বাজেটে প্রতিবার সিগারেটের দাম বাড়ে। আমাদের দেশে ভাগে সিগারেট টানার চল থাকলেও, ভাগে ধোঁয়া খাওয়ার চলটা নেই। সেটাও হয়তো খুব শিগগিরই চালু হয়ে যাবে!’

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষে বাইরে আসতেই এক পাগলের সঙ্গে ধাক্কা খেল ও। পাগলটা হিরুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘দশটা টিয়া দে। তর ভবিষ্যত্ বইল্যা দিই।’

‘দশ টাকায় ভবিষ্যত্!’ হিরু খুশি মনেই মানিব্যাগ থেকে একটা চকচকে নোট বের করে লোকটার হাতে দিল।

টাকাটা হাতে পেয়ে পাগলটা তাতে চুমু খেয়ে বলল, ‘দশ টিয়ায় আইজকাইল একডা বিড়িও মিলে না রে! আর তর ভবিষ্যত্!’

হিরু বিড়বিড় করে বলল, ‘ধূমপান বিষপান। ওসব খায় পাগলে!’

লোকটা সহাস্যে বলল, ‘ক্যান, আমারে কি তর পাগল বইল্যা মনে অয় না?’

 

হিরু আর কোনো কথা না বলে সামনে পা বাড়াল।

একজোড়া তরুণ-তরুণীকে বসে থাকতে দেখল ও। হঠাত্ তরুণীটি চিতল মাঠের মতো তড়পাতে লাগল। তারপর মূর্ছা খেয়ে পড়ে গেল। মুহূর্তেই লোক জমে গেল চারপাশে। হিরুও তাদের একজন।

যুবকটি চিত্কার করে বলতে লাগল, ‘কেউ একজন অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন, প্লিজ!’

ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলল, ‘অ্যাম্বুলেন্স লাগবে না। আপনি ওনার মুখে বাতাস দেন।’

‘বাতাস কিভাবে দেব?’

যুবকের এই প্রশ্নের মাঝেই আরেকজন বলে উঠল, ‘আরে চুমু খান। তাহলেই উনি ঠিক হয়ে যাবেন।’

সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত অনেকেই কথাটাকে জোরালো সমর্থন জানাল। নিরুপায় যুবক বিনা বাক্যব্যয়ে তাদের কথার তালিম করল।

‘বালক ফুঁ বুঝো না, চুমু বুঝো!’ হিরো বিড়বিড় করে বলল।

একটু পরেই নড়েচড়ে উঠল তরুণী। তারপর উঠেও বসল।

‘কী হয়েছিল আমার?’

উপস্থিত জনতা সোত্সাহে পুরো ঘটনা খুলে বলল তাকে।

তরুণী হঠাত্ যুবকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সকালে দাঁত ব্রাশ করোনি কেন?’

যুবক হতবাক।

‘ছিঃ ছিঃ, দাঁত ব্রাশ না করেই তুমি আমাকে..., যাও তোমার সাথে ব্রেকআপ!’ বলেই হনহনিয়ে চলে গেল।

প্রেমিক মহাশয় তো বটেই, হিরুসহ উপস্থিত সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।   g